ভারত-পাকিস্তান জল চুক্তি কোন পথে? তীব্র গরমে পাকিস্তানে জলসঙ্কট আরও বাড়তে চলেছে। ইতিমধ্যেই তারা সিন্ধু জল চুক্তি বাতিল হওয়ার ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। তার মধ্যএই এবার ভারত ঘোষণা করেছে, ৩১ মার্চের মধ্যে শাহপুর কান্দি ব্যারেজ সম্পন্ন হলে রাভি নদীর অতিরিক্ত জলও আর পাকিস্তানে যেতে দেওয়া হবে না।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পর্যাপ্ত সংরক্ষণ পরিকাঠামোর অভাবে রাভি নদীর অতিরিক্ত জল পাকিস্তানে প্রবাহিত হত। কিন্তু এপ্রিল থেকে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে চলেছে, যা পাকিস্তানের দিকে জলপ্রবাহ আরও কমিয়ে দেবে।
জম্মু ও কাশ্মীরের মন্ত্রী জাভেদ আহমেদ রানা সোমবার জানান, এই প্রকল্পের লক্ষ্য খরাপ্রবণ কথুয়া ও সাম্বা জেলায় সেচব্যবস্থা উন্নত করা। তিনি বলেন, 'পাকিস্তানে যে অতিরিক্ত জল যাচ্ছে, তা বন্ধ করা হবে। এটা বন্ধ করতেই হবে।'
পাকিস্তানের উপর কী প্রভাব পড়বে?
বর্তমানে রাভি নদীর উদ্বৃত্ত জল মাধোপুর হয়ে পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়। নতুন ব্যারেজ চালু হলে এই অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে বলে দাবি করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য ভাবে শাহপুর কান্দি ব্যারাজ সিন্ধু জল চুক্তির আওতার বাইরে পড়ে। কারণ চুক্তি অনুযায়ী রাভি নদী সহ ৩টি পূর্বাঞ্চলীয় নদী সতলুজ, বিপাসা এবং রাভি সম্পূর্ণ ভাবে ব্যবহারের অধিকার ভারতেই রয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান পেয়েছে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের জল ব্যবহারের অধিকার।
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তির পরও বহু বছর ধরে পূর্বাঞ্চলীয় নদীর উদ্বৃত্ত জল পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়েছে। তবে গত বছরের পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ওই হামলায় ২৫ জন পর্যটক নিহত হন। এরপর ভারত চুক্তি স্থগিত করে।
পাকিস্তানের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এই পদক্ষেপ বড় ধাক্কা। দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমি সিন্ধু নদী ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। কৃষিখাত পাকিস্তানের GDP-র প্রায় ২৫% অবদান রাখে। ফলে জলপ্রবাহ কমে গেলে ফসল উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। লাহোর ও মুসতানের মতো বড় শহরগুলিও এই নদী ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।
শাহপুর কান্দি ব্যারাজ কী?
শাহপুর কান্দি প্রকল্পের পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। পাঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মীরের মধ্যে রঞ্জিত সাগর বাঁধ ও তার নিম্নপ্রবাহে শাহপুর কান্দি ব্যারাজ নির্মাণের চুক্তি হয়। ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৮৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল। রঞ্জিত সাগর বাঁধ ২০০১ সালে সম্পন্ন হলেও শাহপুর কান্দি ব্যারাজ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে আটকে থাকে। ২০০৮ সালে এটিকে জাতীয় প্রকল্প ঘোষণা করা হয় এবং ২০১৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে পঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মীরের মধ্যে বিরোধের জেরে কাজ আবার থেমে যায়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় সরকার হস্তক্ষেপ করে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করায় এবং ৪৮৫ কোটি টাকার অনুদান ঘোষণা করে। এরপর পূর্ণ গতিতে কাজ এগোয় এবং ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার কথা। প্রকল্পটি চালু হলে প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের সুবিধা মিলবে। পঞ্জাবে অতিরিক্ত ৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমিও উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ভারতের আরও পদক্ষেপ
একই সঙ্গে ভারত চেনাব নদীর উপর একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে, যা ২০২৭–২৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ঝিলম নদীর উপর উলার ব্যারাজ প্রকল্পও পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ২০১২ সালে জঙ্গি হামলার পর বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি উত্থাপন করেছে এবং হেগের আদালতে অভিযোগ জানিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ ভারত জলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে ভারত এই বিষয়টি অস্বীকার করেছে। সব মিলিয়ে, সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলি দিল্লির নীতিগত অবস্থানের একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পূর্বে অসম্পূর্ণ প্রকল্পের কারণে যে জল পাকিস্তানে প্রবাহিত হত, তা আর হবে না।