
ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভ ২০২৬-এ কলি পুরী।মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ। সংকটে বিশ্ববাণিজ্য। অস্থিরতা। মৃত্যুমিছিল। ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভ ২০২৬-এর সমাপনী ভাষণে বিশ্বশান্তির বার্তা দিলেন ইন্ডিয়া টুডে গোষ্ঠীর ভাইস চেয়ারপার্সন ও এগজিকিউটিভ এডিটর ইন চিফ কলি পুরী।
গণতন্ত্র নিয়ে যে আশার কিরণ ছিল, সেটাই এখন প্রশ্নের মুখে বলে মনে করেন কলি পুরী। তাঁর কথায়,'ধর্মতন্ত্র এবং রাজতন্ত্র নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। এখন দেখা যাচ্ছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলি আর সামলে রাখতে পারছে না নেতাদের বিরাট ব্যক্তিত্বকে। এখন দেখছি, ব্যক্তিতন্ত্র। মনে হচ্ছে, গণতন্ত্রও নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে পারে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, এটাই এখন সময়ের দাবি'।
কলি পুরীর পুরো ভাষণ পড়ুন-
শুভ সন্ধ্যা
গত বছর আমি এখানে দাঁড়িয়ে এক পরিবর্তনশীল বিশ্বের কথা বলেছিলাম। আজ রাতে মনে হচ্ছে যেন সেই অস্থিরতা আর পরিবর্তনের হাওয়া এক অতি-বিশালাকার রূপ নিয়েছে। আমাদের বিশ্বব্যবস্থা পতনের মুখে। আর বিশ্ববাণিজ্য এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে আটকে আছে।
আজ রাতে মনে হচ্ছে সেই পরিবর্তন অতি-বিশালাকার রূপ নিয়েছে। তার ফলে আমাদের বিশ্বব্যবস্থা এখন পতনের মুখে।
আমরা প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখলাম, যুদ্ধকৌশল দ্রুত ঠিক হল। আমরা যা কিছু নৈতিকতা বলে মনে করতাম, তা হঠাৎ করেই আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে।
সীমানা।
শিষ্টাচার।
নিরাপত্তা।
নীতি।
যুদ্ধের নিয়ম।
সৌজন্যের মূল্য।
শান্তি ও সমৃদ্ধি।
ধর্মতন্ত্র এবং রাজতন্ত্র সব সময়ই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। এই শতাব্দীর সবচেয়ে ভরসাযোগ্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা হল গণতন্ত্র। এই ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলি এখন নেতাদের বিশাল ব্যক্তিত্বকে আর সামলে রাখতে পারছে না।
গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব যে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের মধ্যে চলত, তা আজ লঙ্ঘিত। আমরা এখন যাকে দেখছি, সেটাকে আমি বলছি- পার্সোনাক্রেসি বা ব্যক্তিতন্ত্র।

মনে হচ্ছে, গণতন্ত্রও নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে পারে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, এটাই এখন সময়ের দাবি।
এই যুদ্ধ শুরুর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার, আমি তেহরান থেকে ফিরেছিলাম। আমরা ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। যিনি আজ একটি পরিচিত নাম। এক জাদুকরী আয়না-খচিত হলে আমাদের সাক্ষাৎকার শেষ করে তিনি জেনেভায় শান্তি আলোচনার উদ্দেশে রওনা হন।
আমাদের বিমান ছিল একদিন পর, তাই আমরা তেহরানের রাস্তায় ঘুরে বেড়ালাম। ইরানের ভেতরের দৃশ্য সাধারণত আড়ালেই থাকে, তাই আমাদের কৌতূহল ছিল প্রচুর। তেহরান কোনও পোস্টকার্ডের মতো সুন্দর বা ঐতিহাসিক শহর নয়। ধুলোমাখা এই শহরটি রমজানের পবিত্র ছন্দে চলছিল, ভবিষ্যতের সেই ভয়াবহ উন্মাদনা সম্পর্কে যা ছিল একেবারেই অন্ধকারে।
এখানকার মানুষই আসল আকর্ষণ। উষ্ণ এবং কাব্যিক। তাঁরা আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন কবিতা আর গল্পের ছলে। হয়তো আপনারা ভাবছেন আমি কোনও একটা পক্ষ নিচ্ছি।
হ্যাঁ, আমি পক্ষ নিচ্ছি।
আমি আমাদের সবার পক্ষে।
মানবতার পক্ষে, সমস্ত মানুষের পক্ষে।
আমাদের মেধার পক্ষে।
ঘরকে আলোকিত করা ছোট্ট হাসির পক্ষে।
স্বচ্ছ নীল আকাশের পক্ষে।
সেই বাড়িগুলির পক্ষে যা 'ঘর' হয়ে ওঠে।
পরিবারকে বেঁধে রাখা ভালোবাসার পক্ষে।
প্রস্ফুটিত ফুলের পক্ষে।
কাঙ্ক্ষিত প্রার্থনার পক্ষে।
সব কিছু বিফল হওয়ার পরেও যাঁরা আশা ছাড়েন না, তাঁদের পক্ষে।
সেই অদৃশ্য সুতোর পক্ষে যা আমাদের সবাইকে একসূত্রে বেঁধে রাখে। অথবা রাখা উচিত।
এই যুদ্ধের অনেক সত্য এবং অনেক দিক আছে, আর আমরা আপনাদের সামনে একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। গত দুই দিনে আপনারা ১০ জন বিদেশি দূতের কথা শুনেছেন, যাতে আপনারা একটি তথ্যনির্ভর মতামত তৈরি করতে পারেন।
আসলে এই কনক্লেভ এবং আমাদের নিউজরুমে আমাদের চেষ্টা সব সময়ই এমনটা ছিল। আমাদের অতিথিদের তালিকার সঙ্গে সবাই সবসময় একমত হন না। আমরা যখন ইয়াসিন মালিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, তখন একটি গোষ্ঠী আপত্তি তুলেছিল। আমরা সলমন রুশদিকে আমন্ত্রণ জানালে কংগ্রেস আপত্তি করেছিল। আবার দলাই লামাকে আমন্ত্রণ জানানোয় চিনারা অসন্তুষ্ট হয়েছিল।
এই বছরও বিভিন্ন মহল আমাদের বক্তা নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আমরা বিশ্বাস করি যে, বিতর্কিত ব্যক্তিদের কণ্ঠরোধ করে নয়, বরং তাদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এবং তাদের মতামতকে পরীক্ষার মুখে ফেলে গণতন্ত্র ও নিউজরুমকে শক্তিশালী করা। আমরা কঠিন আলোচনা থেকে পিছিয়ে আসি না। আমরা বিশ্বাস করি বর্জন নয়, বরং মতের বিনিময় হল সমাধানের পথ।
আর সম্ভবত আমাদের মধ্যে আরও অনেকে যদি এমনটা ভাবতেন, তবে আমরা এই যুদ্ধ এড়াতে পারতাম।
এই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে আজ অনেক দেশ ক্ষতবিক্ষত, আর এই হল বর্তমান মৃত্যুর পরিসংখ্যান। সবাই কেবল নিজের মৃতদেহ গুনছে। অথচ এই যুদ্ধ জাতীয়তা বোঝে না, এটি আপনার বা তাদের সব কিছুকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রায়ই 'এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ'-এর কথা বলেন। অন্যদেরও এতে কান দেওয়া প্রয়োজন।
গত ১৫ দিনে আমাদের এই ভঙ্গুর পৃথিবী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পারমাণবিক বোমার চেয়ে তিন গুণ বেশি বিস্ফোরক শক্তির আঘাতে জর্জরিত হয়েছে। আধুনিক যুগের ঐতিহাসিক ইউভাল নোয়া হারারি সতর্ক করে বলেছেন,'এমন কি হতে পারে যে আমরা ইতিমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে রয়েছি, অথচ আমরা তা এখনও উপলব্ধি করতে পারিনি? আপনি যদি ১৯৪১ সালের মে মাসে মানুষকে জিজ্ঞেস করতেন, তারা বলত না যে তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে বাস করছে। কেবল মহাকালের দর্পণে তাকালেই আমরা তা বুঝতে পারি'।
পিছন ফিরে তাকালে, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধকে হয়ত দেখা হবে এমন কিছু হিসেবে যা মানবতাকে অশুভ শক্তি, নিপীড়ন এবং পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করেছে। অথবা এটি হতে পারে স্রেফ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
আমি বিখ্যাত কবি মাহমুদ দারুইশের কথা দিয়ে শেষ করতে চাই-
'যুদ্ধ শেষ হবে এবং নেতারা করমর্দন করবেন, আর সেই বৃদ্ধা মা তাঁর শহিদ ছেলের জন্য অপেক্ষা করে যাবেন, সেই মেয়েটি তাঁর প্রিয়তম স্বামীর জন্য অপেক্ষা করবেন, আর শিশুরা অপেক্ষা করবে তাঁদের বীর পিতার জন্য। আমি জানি না কে স্বদেশের মাটি বিক্রি করে দিয়েছিল, কিন্তু আমি জানি তার মূল্য কে চুকিয়েছিল'।
২০২৬-এর কনক্লেভ শেষ করার জন্য এটি একটি চিন্তাশীল মুহূর্ত। তবে দিনশেষে আমাদের যা আছে, তা উদযাপন করি। কারণ এই মুহূর্তে আমাদের কারণেই আমরা বেঁচে আছি। আর বাঁচার মাধ্যমেই আমাদের একে সম্মান জানানো উচিত।
আর আজ আপনারা টি-টোয়েন্টি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ এবং বলিউড আইকন অক্ষয় কুমারের দুর্দান্ত উপস্থিতির মাঝে ডুবে আছেন। এই মুহূর্তটি প্রাণভরে উপভোগ করুন।
আগামী বার দেখা হওয়া পর্যন্ত, আমাদের সবার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।
ধন্যবাদ।