কেন ইলেকট্রিক ট্রেনের পাশাপাশি এখনও দরকার ডিজেল ট্রেন? (ছবি: পিক্সেলস)একটা সময় রেল নির্ভর করত স্টিম এবং ডিজেল ইঞ্জিনের উপর। ট্রেন স্টেশনে ঢোকার আগেই দূর থেকে দেখা যেত ধোঁয়ার কুণ্ডলী। তবে ধীরে ধীরে বদলে গিয়েছে এই ছবি। বর্তমানে ভারতে এই দৃশ্য প্রায় দেখাই যায় না। কারণ, ভারতীয় রেলের ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের মোট ৭০,১৪২ রুট কিলোমিটারের (RKM) মধ্যে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৬৯,৮৭৩ রুট কিলোমিটারের বৈদ্যুতিকীকরণ হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ ভারতের রেল নেটওয়ার্কের ৯৯.৬ শতাংশেরও বেশি এখন ইলেকট্রিকের আওতায় রয়েছে। তারপরও ডিজেল ইঞ্জিনের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু কেন?
হিসেব বলছে, ২০০৯-১০ সালে ভারতীয় রেলের মাত্র ১৮,৯২৭ RKM ইলেকট্রিক লাইন ছিল। আর ২০১৪ সালের মার্চে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১,৬১৪ RKM। কিন্তু ১২ বছর পর, ২০২৬ সালের মার্চে চিত্রটা পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। ইলেকট্রিক রেললাইন পৌঁছে গিয়েছে ৬৯,৮৭৩ RKM-এ।
RKM কী?
এখান আপনাদের মধ্যে অনেকেই জিজ্ঞেস করতে পারেন, এই RKM বা রুট কিলোমিটার বিষয়টি ঠিক কী? রুট কিলোমিটার বলতে একটি রেলপথে দু'টি নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যেকার দূরত্বকে বোঝায়। পাশাপাশি কতগুলি ট্র্যাক রয়েছে, সেটা এই হিসেবের মধ্যে ধরা হয় না।
গত সপ্তাহে ভারতীয় রেলের এই বৈদ্যুতিকীকরণের পরিবর্তনের প্রশংসা করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
তিনি বলেন, '২০১৫-১৬ সালে রেল ২৯৩ কোটি লিটার ডিজেল ব্যবহার করেছিল। ২০২৪-২৫ সালে সেটা কমে ১০৮ কোটি লিটারে এসেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এর ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। এতে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে পারব। এটি একটি বড় সাফল্য।'
তিনি আরও দাবি করেন, ভারতীয় রেল খুব তাড়াতাড়ি ১০০ শতাংশ ইলেকট্রিফিকেশনের টার্গেটে পৌঁছে যাবে।
বাকি ব্রডগেজ রেলপথগুলির বিদ্যুতায়ন হয়ে গেলে ১০০ শতাংশ বিদ্যুতায়ন অবশ্যই একটি বড় মাইলস্টোন হবে। কিন্তু এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গোটা নেটওয়ার্কের ইলেকট্রিফিকেশন হয়ে গেলেই যে ভারতীয় রেল ডিজেলকে পুরোপুরি বিদায় জানাতে পারবে, বিষয়টা এমন নয়।
ভারতীয় রেল এখনও পুরোপুরি ডিজেল মুক্ত হচ্ছে না। কারণ, অমিত শাহ যে LNG-চালিত ট্রেনটির উদ্বোধন করেছেন, ওই ট্রেনটিই LNG ও ডিজেল দুই ধরনের জ্বালানিতে চলতে পারে।
স্টিম থেকে ডিজেল, তারপর ইলেকট্রিক
ভারতে বৈদ্যুতিক রেলের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দী পুরনো। ১৯২৫ সালে বম্বে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস থেকে কুরলা হারবারের মধ্যে প্রথম বিদ্যুতচালিত ট্রেন চলেছিল। কিন্তু তারপর এই প্রোজেক্টের গতি কমতে থাকে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় মাত্র ৩৮৮ রুট কিলোমিটার রেলপথ বিদ্যুতায়িত ছিল। এরপর কয়েক দশক ধরে স্টিম ইঞ্জিনই ছিল রেলের প্রধান ভরসা। ১৯৬০-এর দশকে বারাণসীতে ডিজেল লোকোমোটিভ ওয়ার্কস থেকে ডিজেল ইঞ্জিন তৈরি শুরু হওয়ার পর ডিজেলচালিত ট্রেনের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে।
১৯৮০-এর দশকে ভারতীয় রেল স্টিম ইঞ্জিন সরিয়ে ডিজেল ও বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনের দিকে এগোতে শুরু করে। ততদিনে পূর্ব ভারতের খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণ বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশায় বৈদ্যুতিক ট্রেন চলাচল শুরু হয়ে গিয়েছিল।
১৯৯৫ সালে জলন্ধর থেকে ফিরোজপুরের মধ্যে শেষবারের জন্য স্টিম ইঞ্জিন চলেছিল। যদিও এখনও ঐতিহ্যবাহী পরিষেবায় স্টিম ইঞ্জিন দেখা যায়। সেগুলিতে সাধারণ মানুষ টিকিট কেটে ভ্রমণও করতে পারেন।
১৯৯০-এর দশকের মধ্যে প্রথম বড় পরিবর্তনে স্টিমকে সরিয়ে জায়গা করে নেয় ডিজেল। নিয়মিত পরিষেবায় স্টিমের বদলে ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার শুরু হয়। এরপর ২০০০-এর দশক থেকে বিদ্যুৎ দ্বিতীয় বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। ২০১৪ সালের পর এই পরিবর্তনের গতি আরও বেড়ে যায়।
২০১৪ সালে ভারতে ২১,৮০১ RKM রেলপথ বিদ্যুতায়িত ছিল। ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে এই সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ৬৯,৮৭৩ RKM হয়েছে।
এই গতি বোঝার আরও একটি উপায় হল প্রতিদিন কত কিলোমিটার রেলপথ বিদ্যুতায়িত হয়েছে। রেল মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪-১৪ সালে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১.৪২ কিলোমিটার রেলপথের ইলেকট্রিফিকেশন হতো। ২০১৯-২৫ সালে সেই গতি বেড়ে প্রতিদিন ১৫ কিলোমিটারেরও বেশি হয়েছে।
অর্থাৎ, গত এক দশকে ভারতীয় রেলের ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের এক-তৃতীয়াংশেরও কম ইলেকট্রিফিকেশন হয়েছিল। এখন প্রায় গোটা নেটওয়ার্কই বিদ্যুতের আওতায় চলে এসেছে।
বিদ্যুতায়নের সঙ্গে কমেছে ডিজেলের খরচ?
বেশি সংখ্যক রুট ও ট্রেন বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনের আওতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণে রেলের ডিজেলের প্রয়োজন কমেছে।রেল মন্ত্রকের হিসেব বলছে, ২০১৫-১৬ সালে ট্রেন চালানোর জন্য ২৯৩ কোটি লিটার ডিজেল ব্যবহার হয়েছিল। ২০২৪-২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১০৮ কোটি লিটারে। অর্থাৎ, নয় বছরে ১৮৫ কোটি লিটার বা প্রায় ৬৩ শতাংশ ডিজেল ব্যবহার কমেছে।
১৫ এপ্রিল ২০২৬-এ প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোতে প্রকাশিত রেল মন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে বিদ্যুতায়নের ফলে প্রায় ১৮০ কোটি লিটার ডিজেল সাশ্রয় হয়েছে। বিদ্যুতায়ন না হলে ট্রেন চালাতে এই জ্বালানি প্রয়োজন হতো।
সরকারের দাবি, এর ফলে ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রয়োজন কমেছে। ডিজেলের তুলনায় বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি সাশ্রয়ী। রেল মন্ত্রকের মতে, বিদ্যুতায়নের ফলে প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা বেঁচে গিয়েছে।
এছাড়া বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনের ফলে ট্রেনের গতি বাড়ানো গিয়েছে। সেই সঙ্গে ব্রেকিং হয়েছে আধুনিক। নতুন ধরনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনের কেবিনে লোকো পাইলটদের কাজের পরিবেশও আগের তুলনায় অনেক আরামদায়ক হয়েছে।
তাহলে ডিজেল ইঞ্জিন পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না কেন?
এটাই হল সবথেকে বড় প্রশ্ন। আর তার উত্তরে বলা যায়, বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনের একটি বড় দুর্বলতা রয়েছে। সেটি হল, এতে সবসময় ইলিকেট্রিক সাপ্লাই ব্যবস্থা সচল থাকা জরুরি। ২০১২ সালের জুলাইতে উত্তর ভারতের বিদ্যুৎ গ্রিড ভেঙে পড়ার সময় শত শত ট্রেন আটকে যায়। এই সময় দূরপাল্লার রাজধানী ও শতাব্দী এক্সপ্রেস সহ অনেক ট্রেনকে ডিজেল ইঞ্জিন দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে হয়েছিল।
এছাড়াও বৈদ্যুতিক রেলপথের জন্য ওভারহেড ইকুইপমেন্ট বা OHE প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গে একটি ঘূর্ণিঝড়ের সময় গাছ ভেঙে ওভারহেড তারের উপর পড়ায় আধুনিক বন্দে ভারত ট্রেনও থেমে গিয়েছিল।
২০২৬ সালের মার্চে রেল মন্ত্রক সংসদকে জানিয়েছিল, ভারতীয় রেলের ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’-এর জন্য ডিজেল ইঞ্জিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালে সংসদে দেওয়া এক জবাবে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেছিলেন, ভারতীয় রেলে ডিজেল ইঞ্জিনের ব্যবহার ধাপে ধাপে কমিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে দুর্যোগ মোকাবিলা, কৌশলগত প্রয়োজন এবং শান্টিংয়ের মতো কাজে ডিজেল ইঞ্জিনের প্রয়োজন থাকবেই।
আসলে রেল ইয়ার্ড ও সাইডিংয়েও ডিজেল ইঞ্জিনের প্রয়োজন হয়। প্ল্যাটফর্ম, ইয়ার্ড এবং রক্ষণাবেক্ষণ শেডের মধ্যে খালি ট্রেনের রেক সরানোর জন্য এগুলি ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া ভারতের ছোট পরিসরে টিকে থাকা মিটার গেজ ও ন্যারোগেজ রেলপথেও ডিজেল এখনও গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে কালকা-শিমলা, কাংড়া ভ্যালি, দার্জিলিং এবং নীলগিরির মতো রুট রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী কিছু পরিষেবায় স্টিম ইঞ্জিন ব্যবহার করা হলেও নিয়মিত পরিষেবায় ডিজেল ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অর্থাৎ, ভারতীয় রেলের প্রায় গোটা ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের উপর খুব শীঘ্রই বৈদ্যুতিক তার দেখা যেতে পারে। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতি, শান্টিং, কৌশলগত প্রয়োজন এবং যেসব নতুন রুটে এখনও বিদ্যুতায়ন পৌঁছয়নি, সেখানে ডিজেল ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাচ্ছে।