প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফসংসদে বিশেষ অধিবেশনে কেন্দ্র যে ডিলিমিটেশন বিল এনেছে, তা পাশ হয়ে গেলে ভারতের রাজনৈতিক বা নির্বাচনী মানচিত্র অনেকটাই বদলে যেতে পারে। কিছু রাজ্যের প্রতিনিধি বাড়বে,কিছু রাজ্যের কমবে। তবে তা বিরাটর কিছু হেরফের হবে না বলেই জানা যাচ্ছে। যাবতীয় বিতর্কের মধ্যেই একটি বিষয় নজরে থাকা প্রয়োজন, তা হল পাক অধিকৃত কাশ্মীর (PoK)। ডিলিমিটেশন বিল কার্যকর হলে, জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভায় পাক অধিকৃত কাশ্মীর (PoK)-এর জন্য ২৪টি আসন সংরক্ষিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। অর্থাত্ ভারত যে দ্রুত পাক অধিকৃত কাশ্মীরকে ভারতভূখণ্ডের আওতায় আনার দিকে এগিয়ে চলেছে, তা মোটামুটি নিশ্চিত।
যখন থেকে পাকিস্তানের দখলে গিয়েছে কাশ্মীরের একটি অংশ, সেই থেকেই ওই অঞ্চলে ভারতের সংসদীয় প্রতিনিধি নেই। কিন্তু এবার পাকিস্তানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে ডিলিমিটেশন বিল। এই বিলটি পাক অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) আইনত নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়া চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিধানগুলি নির্ধারণ করেছে।
কীভাবে কাজ করবে ডিলিমিটেশন বিল?
এই বিলে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, লোকসভার আসন ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করা হবে। সাম্প্রতিকতম জনগণনার ভিত্তিতে যাতে জনপ্রতিনিধি সমবণ্টন হয়, তারই প্রয়াস এই বিল। যদিও কংগ্রেস সহ বিরোধীদের দাবি, মহিলা সংরক্ষণের আড়ালে আসলে ভারতকে ভাগ করতে চাইছে কেন্দ্র। দক্ষিণ ভারতের প্রতিনিধি কমিয়ে ফেলার চক্রান্ত। যেহেতু দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অনেকটাই সফল, তাই তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি কমে যাবে এই বিল পাশ হলে। লাভবান হতে পারে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলি। তাদের আসন সংখ্যা বেড়ে যেতে পাকে। এই বিলটি সংসদের উভয় কক্ষে পাস হলে লোকসভার কাঠামোতে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসবে। এর ফলে ভারতের জাতীয় স্তরে এমন একটি কণ্ঠস্বর যুক্ত হবে যা আগে কখনও প্রতিনিধিত্ব পায়নি, তা হল পাক অধিকৃত কাশ্মীর (PoK)।
পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ইতিহাস
১৯৪৭ সালের অক্টোবরে জম্মু-কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংয়ের স্বাক্ষরিত 'ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন' অনুযায়ী, ভারত পাক অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) ওপর তার অধিকার দাবি করে। পাকিস্তানের মদতপুষ্ট অনুপ্রবেশকারীদের আক্রমণের প্রেক্ষিতে মহারাজা ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চান এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিতে সম্মত হন। সেই সময় থেকেই নয়াদিল্লি বজায় রেখেছে, বর্তমানে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলি সহ সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৯৪ সালে ভারতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, আছে এবং থাকবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানকে তাদের দখল করা এলাকা খালি করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ভারতের সরকারি বিবৃতি এবং কূটনৈতিক আলোচনায় আজও এই প্রস্তাবটিকেই প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। তবে বর্তমানে পরিস্থিতির কারণে ওই অঞ্চলগুলিতে নির্বাচন করানো সম্ভব নয় বলে জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভার ২৪টি আসন খালি রাখা হয়। বিধানসভার মোট ১১৯টি আসনের মধ্যে এই ২৪টি আসন শূন্য থাকায়, বর্তমানে স্বীকৃত আসনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৫।
পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ভারসের সংসদীয় প্রতিনিধি
ডিলিমিটেশন বিলে ভবিষ্যতে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতের প্রশাসনিক দখলের ইঙ্গিত স্পষ্ট রয়েছে। পাক অধিকৃত কাশ্মীর যে ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা আরও একবার পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দিয়ে বুঝিয়ে দিল ভারত। একই সঙ্গে ভারত যে কোনও মুহূর্তে পাক অধিকৃত কাশ্মীরকে পাকিস্তানের দখলমুক্ত করতে পারে, তারও ইঙ্গিত রয়েছে বিলে। বিজেপি নেতা বুরা নরসায়া গৌড়ের কথায়, 'এই ডিলিমিটেশন বিলের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে অংশটি আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি, তা হল PoK-এর জন্য আসন বরাদ্দ করার বিধান। জাতি, ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি ভারতীয়র স্বপ্ন হল PoK-কে ফিরে পাওয়া, যা আইনি, সাংবিধানিক এবং নৈতিকভাবে ভারতের অংশ, এই বিলের মাহাত্ম্য এখানেই।'
ভারতের ডিলিমিটেশন বিলে যে পাকিস্তানের পা কাঁপা শুরু হয়ে গিয়েছে, তা পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবির কথায় নিশ্চিত। বলছেন, 'আমরা এই মিডিয়া রিপোর্টগুলো দেখেছি, সংসদে ডিলিমিটেশন বিলটি পেশ করা হয়েছে। আমরা জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের তথাকথিত সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং সেই সঙ্গে PoK সংক্রান্ত যে কোনও বিধানকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।'