LPG Supply Problem: রান্নার গ্যাস নিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগের দিকে এগোচ্ছে।মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জের। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা রীতিমতো ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভারতেও। দেশের বিভিন্ন শহরে এলপিজি সিলিন্ডারের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় সমস্যায় পড়েছে হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ক্যান্টিন পরিষেবা। কোথাও মেনুতে কাটছাঁট করা হচ্ছে। কোথাও আবার বিকল্প কোনও জ্বালানিতে রান্না চলছে। আবার কোথাও সাময়িকভাবে রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বড় শহরগুলিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। কারণ রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলিতে রান্নার জন্য মূলত বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়। সেই সিলিন্ডারের সাপ্লাই কমে যাওয়ায় ব্যবসায় বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। এমনটাই জানাচ্ছেন রেস্তোরাঁ মালিকরা।
দিল্লির বাসন্ত কুঞ্জে ক্লাউড কিচেন চালান গগনদীপ সিং সাপরা। জানালেন, লোকাল সাপ্লায়াররা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে বর্তমানে এলপিজি সিলিন্ডার দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাসের অভাবে তাঁর রেস্তোরাঁর প্রায় ৮০ শতাংশ খাবারের আইটেম আপাতত বন্ধ রাখতে হয়েছে। কারণ বেশির ভাগ খাবারই তন্দুরে তৈরি হয়।
মুম্বইতেও একই ছবি। জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ 'বসন্ত ভবনে' গ্যাস বাঁচাতে বেশ কয়েকটি আইটেম সাময়িক ভাবে বন্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে দোসা এবং পাও ভাজির লাইভ কাউন্টার বন্ধ রাখতে হয়েছে। রান্নাঘরে এখন ইন্ডাকশন চুলা ও কয়লার চুলা ব্যবহার করে কোনও ভাবে পরিষেবা চালানো হচ্ছে। তবে সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে পুরো রেস্তোরাঁ বন্ধ করতে হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন মালিকরা।
চেন্নাইয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। গ্যাস বিতরণকারী সংস্থার সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় পাঁচ লক্ষ বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ আপাতত বন্ধ রয়েছে। ফলে হোটেল ও শিল্পক্ষেত্রকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নতুন সিলিন্ডারের সরবরাহ ২৮ মার্চের আগে পাওয়া যাবে না বলেও জানানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতির জেরে তামিলনাড়ুর কিছু জায়গায় ইতিমধ্যেই হোটেল বন্ধ রাখতে হয়েছে। চেন্নাইয়ের একটি হোটেলের বাইরে নোটিস টাঙিয়ে জানানো হয় যে এলপিজি না থাকায় ১১ মার্চ প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ফলে সকালবেলা চা ও জলখাবারের জন্য আসা বহু গ্রাহক হতাশ হয়ে ফিরে যান।
হায়দরাবাদে জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ চেন ‘শাহ ঘাউস ক্যাফে’ তাদের বিখ্যাত বিরিয়ানি রান্নার জন্য আবার ঐতিহ্যবাহী কাঠের চুলার ব্যবহার শুরু করেছে। কারণ বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। রমজানের সময় খাদ্য ব্যবসার চাহিদা বেশি থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এলপিজি ঘাটতির প্রভাব দেখা গিয়েছে দিল্লি হাইকোর্টের আইনজীবীদের ক্যান্টিনেও। সেখানে একটি নোটিসে জানানো হয়েছে যে গ্যাস সিলিন্ডার না থাকায় রান্না করা খাবার পরিবেশন করা সম্ভব নয়। আপাতত স্যান্ডউইচ, স্যালাড এবং ফলের চাটের মতো সীমিত খাবারই দেওয়া হবে।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন শিল্প সংগঠনও সতর্কবার্তা দিতে শুরু করেছে। ছত্তীসগঢ় হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, আতঙ্কে অতিরিক্ত সিলিন্ডার মজুত না করতে। বরং ইন্ডাকশন চুলা, হট প্লেট বা রাইস কুকারের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রেল পরিষেবাও সম্ভাব্য সমস্যার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভারতীয় রেলওয়ে ক্যাটারিং অ্যান্ড ট্যুরিজম কর্পোরেশন (IRCTC) স্টেশনগুলির ক্যাটারিং ইউনিটকে মাইক্রোওয়েভ বা ইন্ডাকশন ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি ট্রেনে পর্যাপ্ত রেডি-টু-ইট খাবার মজুত রাখার কথাও বলা হয়েছে।
এই সঙ্কটের প্রভাব এখন সাধারণ মানুষের ঘরেও পৌঁছতে শুরু করেছে। ভোপাল ও চণ্ডীগড়ের মতো শহরে এলপিজি এজেন্সির সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক গ্রাহক জানিয়েছেন, অনলাইন বুকিং কাজ না করায় তাঁদের সরাসরি এজেন্সিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার অভিযোগ করেছেন, কালোবাজারিতে সিলিন্ডারের দাম ১৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে ভারতের প্রায় ৩০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকার গৃহস্থালির গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তেল মন্ত্রকের নির্দেশ অনুযায়ী, অগ্রাধিকার নয় এমন ক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরিয়ে রান্নার গ্যাস, পাইপড গ্যাস ও সিএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি তেল সংস্থাগুলিকে এলপিজি উৎপাদন ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপ্লাই ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দেশের আরও বহু রেস্তোরাঁ, ছোট ব্যবসা এবং পরিষেবা সাময়িক ভাবে বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে জ্বালানি সঙ্কটের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।