বুলডোজার বিতর্কের মাঝেই মণিকর্ণিকা ঘাটের নতুন প্ল্যান, কাশীর ‘মহাশ্মশান’ ঘিরে তুঙ্গে রাজনীতি।বুলডোজার বিতর্কের মাঝেই প্রকাশিত হল ছবি। কাশীর মণিকর্ণিকা ঘাটের প্রস্তাবিত রেনোভেশনের প্ল্যান রিলিজ করল উত্তরপ্রদেশ সরকার। কাশীরের 'মহাশ্মশান' মণিকর্ণিকা ঘাটের 'আধুনিকিকরণ'কে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছে উত্তরপ্রদেশে। এক দিকে চলছে পুরনো নির্মাণ ভাঙাচোরার কাজ। অন্যদিকে নতুন নির্মাণকাজও চলছে। আর সেই কাজকে কেন্দ্র করেই বিতর্ক, অভিযোগ। এ সবের মধ্যেই শনিবার বারাণসী সফরে আসেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। বলেন, 'কাশীকে বদনাম করার চেষ্টা চলছে।' এরপরই মণিকর্ণিকা ঘাটের প্রস্তাবিত প্ল্যানের ছবি রিলিজ করেন।
মণিকর্ণিকা ঘাট চত্বরে বিভিন্ন নির্মাণ ভাঙচুরের ঘটনায় কংগ্রেস বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে। তবে সরকারের দাবি, এই প্রকল্পের লক্ষ্য একটাই। ঐতিহ্যবাহী এই ঘাটের পরিকাঠামো আধুনিক করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মণিকর্ণিকা ঘাটের প্ল্যাটফর্ম আরও বড় করা হবে। এর ফলে একসঙ্গে একাধিক শেষকৃত্য সম্পন্ন করা যাবে। বিশ্বমানের পরিকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। 
এতদিন মণিকর্ণিকা ঘাটে যেতে হলে বহু সরু গলি দিয়ে যেতে হত। দাহ-সংস্কারের ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই। কোনওমতে, সেই প্রাচীন পন্থাতেই যেন সব চলছে। গঙ্গা লাগোয়া পুরো এলাকায় জমে টন-টন নোংরা।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর 'ভিশন কাশী' প্রোজেক্টে এই মণিকর্ণিকা ঘাটের পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও যোগ করেন। ফার্স্ট ফেজের জন্য ইতিমধ্যেই ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, খুব শীঘ্রই সম্পূর্ণ নতুন রূপে এই ঐতিহাসিক শ্মশানঘাটকে গড়ে তোলা হবে।
মণিকর্ণিকা ঘাট নিয়ে একটি প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। এখানে নাকি চব্বিশ ঘণ্টা, বছরে ৩৬৫ দিন চিতার আগুন কখনও নেভে না। দাহকার্য থেকে ওঠা ভস্ম কাশী করিডর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। প্রতিদিন অসংখ্য পুণ্যার্থী ও পর্যটকের সমাগম হয়।
যদিও এই রেনোভেশন করতে গিয়ে পুরনো একাধিক স্ট্রাকচার ভাঙা হচ্ছে। একটি 'চবুতরা' ভাঙাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক চরমে উঠেছে। অভিযোগ, সেখানে থাকা একাধিক মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার অবশ্য জানিয়েছে, নতুন পরিকল্পনা মেনেই ঘাটটি গড়ে তোলা হচ্ছে।
শনিবার বারাণসী পৌঁছে সার্কিট হাউসে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেন, কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃত ভাবে কাশীকে বদনাম করার চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, কাশী বিশ্বনাথ ধাম প্রকল্পের সূচনালগ্নেও একই ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল। এখন আবার ভাঙা মূর্তির ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। যোগীর কথায়, 'মূর্তি ভাঙা হচ্ছে, এর চেয়ে বড় ডাহা মিথ্যে আর কিছু হতেই পারে না।' তিনি আরও বলেন, কাশী আজ এক নতুন আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী বারবার, প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষা করেই কাশীকে আধুনিক রূপে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার বিষয়ে জোর দিয়েছেন।
তবে বিরোধিতা থামেনি। উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রায়ের অভিযোগ, মোদী-যোগী সরকার দেশের, কাশীর ও হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য ধ্বংস করেছে। তাঁর দাবি, করিডরের নামে মল তৈরি হয়েছে। কাশী বিশ্বনাথের বহু মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে, এমনকি বটবৃক্ষ ও লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরও রেহাই পায়নি বলে দাবি তাঁর। ২০২৩ সালে মণিকর্ণিকা ঘাট সংস্কারের বদলে সেখানে ধ্বংস চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।
এই ইস্যুতে আরও কড়া প্রতিক্রিয়া দেন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা। তাঁর বক্তব্য, মণিকর্ণিকা ঘাটে বুলডোজার চালিয়ে শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তিনি বলেন, মণিকর্ণিকার ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি লোকমাতা অহিল্যাবাই হোল্করের স্মৃতিও এর সঙ্গে জড়িত। উন্নয়নের নামে, কিছু মানুষের বাণিজ্যিক স্বার্থে, দেশের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ধনসম্পদ মুছে ফেলা ঘোর পাপ। এর আগেও রিনোভেশনের নামে বহু প্রাচীন মন্দির ভাঙা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কাশীর ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে দেওয়ার এই 'ষড়যন্ত্র' অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত বলেই মত প্রিয়াঙ্কার।
ফলে মণিকর্ণিকা ঘাটের প্ল্যানের ছবি প্রকাশিত হলেও থামছে না বিতর্ক। আধুনিকিকরণ না ঐতিহ্য? এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই কাশীর 'মহাশ্মশান' কেন্দ্র করে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা।