যন্তরমন্তরের প্রতিবাদ সভা।সমাজমাধ্যমের পাতায় ক্ষোভের আগুন জ্বলছিলই। এবার ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল বা ‘ই২০ জ্বালানি’ (E20 Fuel)-র জেরে গাড়ি বিকল হওয়া ও মাইলেজ কমে যাওয়ার অভিযোগে সরাসরি রাজপথে নামলেন দেশের গাড়িচালকেরা। ‘হামারি গাড়ি, হামারা অধিকার; এই স্লোগানকে সামনে রেখে রবিবার দিল্লির যন্তরমন্তরে এক নজিরবিহীন বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ভারতের মাটিতে ই২০ পেট্রোল বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে এটিই প্রথম অন-গ্রাউন্ড বা সরাসরি প্রতিবাদ আন্দোলন। বিশিষ্ট উদ্যোক্তা ও টিভি ব্যক্তিত্ব তহসিন পুনাওয়ালা এবং তাঁর সংগঠন ‘টিম ভারত’-এর নেতৃত্বে এদিন রাজধানীর বুকে সরব হন ক্ষুব্ধ গাড়িচালকেরা।
আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, কেন্দ্র সরকার কোনও রকম দীর্ঘমেয়াদী পরীক্ষা ছাড়াই সাধারণ মানুষের ওপর এই বিতর্কিত নীতি জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মধ্যবিত্ত গাড়ি মালিকদের।
কমছে মাইলেজ, চোকড হচ্ছে ফুয়েল সিস্টেম!
যন্তরমন্তরের প্রতিবাদ সভায় যোগ দেওয়া গাড়িচালকেরা নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। গুরগাঁওয়ের এক তরুণ সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সার্থক জানান, তাঁর ২০১৮ সালের ব্যালিনো গাড়িটি ই১০ (E10) জ্বালানির উপযোগী। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ই২০ পেট্রোল ব্যবহারের ফলে তাঁর গাড়ির মাইলেজ প্রতি লিটারে ১৮ কিলোমিটার থেকে কমে এক ধাক্কায় ১৪ কিলোমিটারের নিচে নেমে গিয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ২২ শতাংশ মাইলেজ কম মিলছে।
দিল্লির পটেল নগরের বাসিন্দা রাজ সিং শোনালেন আরও ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, “টাকা বাঁচানোর চক্করে গত সাত মাস ধরে ই২০ পেট্রোল ভরছিলাম। কিন্তু গত মাসে আচমকাই গাড়ির পাওয়ার কমে যায় এবং ইঞ্জিনের ওয়ার্নিং লাইট জ্বলে ওঠে। মেকানিককে দেখানোর পর পুরো ফুয়েল সিস্টেম পরিষ্কার করতে এবং পার্টস বদলাতে আমার ৩৫ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে।” অন্যদিকে দিল্লির এক স্কোডা স্লাভিয়া গাড়ির মালিক জানান, মাঝরাস্তায় তাঁর গাড়ি আচমকা বন্ধ হয়ে যায়। অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টার থেকে তাঁকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ইথানলের কারণেই এই বিভ্রাট এবং প্রতিদিন এমন ৭-৮টি গাড়ি একই সমস্যা নিয়ে আসছে।
‘সুগার লবি’
প্রতিবাদীদের একাংশ এই কেন্দ্রীয় নীতির পেছনে বড়সড় কর্পোরেট ও রাজনৈতিক চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছেন। সাউথ এক্সটেনশনের বাসিন্দা শিব ভাট তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গড়করির এই অপরিকল্পিত পরীক্ষা আমাদের ভালো গাড়িগুলোকে স্ক্র্যাপ বা লোহা-লক্কড়ে পরিণত করছে। আর অন্য দিকে ওঁর বন্ধুস্থানীয় চিনিকল মালিকেরা ফুলেফেঁপে উঠছেন।”
আসলে ইথানল মূলত তৈরি হয় আখ থেকে। উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলিতে চিনিকল ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা ও বড় ব্যবসায়ীদের যোগ অত্যন্ত গভীর। আন্দোলনকারীদের দাবি, দেশের অশোধিত তেল আমদানির খরচ কমানো বা পরিবেশ রক্ষার দোহাই দেওয়া হলেও, আদতে এই নীতির মাধ্যমে সুগার লবি বা চিনি ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিকল্পের অভাব
র্যালি ড্রাইভার ও গাড়ি বিশেষজ্ঞ রতন ধিলোঁর দাবি, ইথানলের আর্দ্রতা শোষণের (Hygroscopic) ক্ষমতার কারণে গাড়ির ফুয়েল ফিল্টার এবং পুরো পাইপলাইন চোকড বা জ্যাম হয়ে যাচ্ছে। অথচ বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য খাঁটি পেট্রোল কেনার কোনও সহজ বিকল্প রাখা হয়নি। বর্তমানে সাধারণ ই২০ পেট্রোল লিটার প্রতি প্রায় ১০২ টাকায় মিললেও, খাঁটি বা ‘পিওর পেট্রোল’ কিনতে লিটার প্রতি ১৬০ টাকারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে।
তথ্য বলছে, গত ১৫ বছরে ভারতে বিক্রি হওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ গাড়িই ই২০ জ্বালানির উপযুক্ত নয়। ব্রাজিল বা আমেরিকার মতো দেশগুলি কয়েক দশক ধরে ধাপে ধাপে এবং ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির পরিকাঠামো তৈরি করে এই নীতি এনেছিল। কিন্তু ভারত পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই চালকদের ওপর এটি চাপিয়ে দিয়েছে। যদিও অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামানি আগেই জানিয়েছেন যে, ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত বদল হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। তবে রবিবারের এই ছোট বিক্ষোভই প্রমাণ করে দিল যে, দেশের মধ্যবিত্তের ক্ষোভের পারদ কিন্তু ক্রমশ চড়ছে।