৭২ ঘণ্টার মধ্যে জলবিস্ফোরণের ওয়ার্নিং নেপালের ভোটে কোশী নদীর বিধ্বংসী বন্যার পর আরও একটি বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে চোচেন খোলা ও পুরপু সাংপো নদীর সঙ্গমস্থলে একটি বিশাল প্রতিবন্ধক হ্রদ তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানী ও চিনা আধিকারিকরা এই প্রাকৃতিক হ্রদটিকে নিয়ে সতর্ক। কারণ এর জল আটকে রাখা প্রাকৃতিক বাঁধটি দুর্বল হয়ে পড়লে নীচের দিকে ব্যাপক জলস্রোত দেখা দিতে পারে। চিনের জলসম্পদ মন্ত্রক ওই এলাকায় নজরদারি বাড়িয়ে এবং ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে।
ওই এলাকাটি সরাকরি ভারতের সংলগ্ন না হলেও এর নদী ব্যবস্থা ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত। দেখা যাচ্ছে, হ্রদটি এবং দু'টি নদীর সঙ্গমস্থল ভারতীয় সীমান্ত থেকে প্রায় ১২০-১৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। এছাড়াও এটি নেপাল-চিন সীমান্তের রাসুয়াগড়ি-গাইরং সীমান্ত থেকে প্রায় ১৮ কিমি দূরে অবস্থিত।
ভারত থেকে দূরত্ব খুব বেশি না হলেও, আসল উদ্বেগের বিষয় হল এর নদীপথের সংযোগ। এই অঞ্চলের জল নেপালের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গন্ডক নদীর মাধ্যমে বিহারে প্রবেশ করে।
২০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমার আশঙ্কা
চিনের জারি করা একটি সতর্কবার্তা অনুযায়ী, প্রতিবন্ধক হ্রদটির জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূতত্ববিদদের অনুমান, এতে প্রায় ২০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমা হয়েছে। প্রাকৃতিক বাঁধটির পিছনে আরও ৩০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যদি জলের চাপ বেড়ে যায় এবং প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যায় তবে একে GLOF (হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা) হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। যা হিমবাহ বা ভূমিধসের কারণ সৃষ্ট হ্রদ বিস্ফোরণের মতোই। এই পরিস্থিতিতে জল সাধারণ বন্যার মতো ধীরে ধীরে বাড়ে না। বরং পাথর-মাটি-গাছাপালা এবং ধ্বংসাবশেষ বয়ে নিয়ে অত্যন্ত উচ্চগতিতে নীচের দিকে ছুটে যায়।
৭২ ঘণ্টা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই ঝুঁকি নিয়ে চিন ৭২ ঘণ্টার জন্য রিয়েল টাইম মনিটরিং এবং বন্যা পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে। এর উদ্দেশ্য হল, প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গেলে বা প্রসারিত হলে জলের প্রবাহের দিক ও গতি বোঝা। চিনের জলসম্পদ ও বিজ্ঞান মন্ত্রক ২৭ অগাস্ট বিকেল সাড়ে ৩টের দিকে এই সতর্কতা জারি করেছে।
এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, হ্রদের জল শুধু উপটে পড়বে, নাকি পুরো বাঁধটাই ভেঙে যাবে। উভয় ক্ষেত্রেই বিপদের মাত্রা ভিন্ন হবে। যদি জল ধীরে ধীরে ছাড়া হয় তাহলে নীচের দিকের এলাকাগুলি প্রস্তুতির জন্য হয়তো বেশি সময় পাবে। কিন্তু হঠাৎ বাঁধ ভেঙে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি বিশাল বন্যার ঢেউ নীচের দিকে পৌঁছে যেতে পারে।
জল কীভাবে ভারতে পৌঁছতে পারে?
এই পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে নদীর গতিপথ বোঝা জরুরি। চোচেন খোলা ও পুরপু সাংপোর জল নেপালের নদী ব্যবস্থায় এসে মেশে। ভোটে কোশীর জল ত্রিশূলী নদীর দিকে প্রবাহিত হয়। এরপর ত্রিশূলী নদী নারায়ণী বা গন্ডক নদীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং এই নদীটিই নেপাল ছেড়ে ভারতে প্রবেশ করে।
এর অর্থ হল, চিন-নেপাল সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই হ্রদটি সরাসরি ভারতে অবস্থিত নয়, বরং যে নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এর জল প্রভাহিত হয়, তা বিহার ও উত্তর প্রদেশকে সংযুক্ত করেছে। তাই হঠাৎ জলস্তর বেড়ে গেলে নীচের এলাকাগুলিকে সতর্ক থাকতে হবে।
নেপালের ভোটে কোশী নদীর বন্যায় ইতিমধ্যেই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। রাসুয়া, নুয়াকোট এবং ধাদিং সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীতে ভেসে আসা ধ্বংসাবশেষ বেশ কয়েকটি জনপদকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ বলে জানা গিয়েছে। বন্যার পর থেকে নদীর প্রবাহ এবং অববাহিকা অঞ্চলগুলি ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। চিন থেকে আসা সর্বশেষ সতর্কতা এই পর্যবেক্ষণকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
৭২ ঘণ্টার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি হবে প্রতিরোধক হ্রদের জলস্তপ কতটা বাড়বে, প্রাকৃতিক বাঁধটি কতটা স্থিতিশীল থাকবে এবং জল ছাড়ার পরিমাণ ও গতি কেমন হবে। এ কারণেই চিন ক্রমাগত বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলার মহড়া চালাচ্ছে।
এর অর্থ এই নয়, ভারতে বড় ধরনের বন্যা আসন্ন। তবে নেপালের সাম্প্রতিক ধ্বংসলীলা এবং গন্ডক নদী ব্যবস্থার সঙ্গে হ্রগটির সংযোগের কারণে বিহার ও উত্তরপ্রদেশের নদী তীরবর্তী এলাকাগুলিতে সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য। হ্রদটি স্থিতিশীল থাকবে নাকি এর জলস্তর হঠাৎ কমে যাবে, তা নির্ধারণ করার জন্য ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।