টাকাবিদেশি অনুদান নিয়ে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকার ‘বৈদেশিক অনুদান (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী বিধিমালা, ২০২৬’ (FCRA 2.0) কার্যকর করেছে। নতুন এই বিধিমালা অনুযায়ী, ধর্মীয়, সামাজিক, শিক্ষামূলক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য বিদেশি তহবিলের ওপর নজরদারি আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর হবে।
সরকার জানিয়েছে, নতুন নিয়মগুলোর লক্ষ্য হল বিদেশি টাকার ব্যবহারকে আরও স্বচ্ছ এবং পদ্ধতিগত করা। যাতে তা শুধুমাত্র ঘোষিত ও বৈধ উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়। নতুন নিয়মগুলোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় কাজের একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা। ধর্মপ্রচারের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা, বিদেশি নাগরিকদের ভূমিকার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট প্রকাশ এবং বিদেশি ফান্ডের ব্যবহার।
FCRA বলতে কী বোঝায়?
FCRA-এর পূর্ণরূপ হল ফরেন কন্ট্রিবিউশন রেগুলেশন অ্যাক্ট (Foreign Contribution Regulation Act)। এটি এমন একটি আইন যা ভারতে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), ট্রাস্ট, সমিতি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যারা বিদেশী আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করে। এই আইনটি প্রথম ১৯৭৬ সালে প্রণীত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১০ সালে এটি পুনরায় চালু করা হয়।
এই আইনের উদ্দেশ্য হল দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জনস্বার্থের বিরুদ্ধে বিদেশি অর্থের ব্যবহার রোধ করা। FCRA রেজিস্ট্রেশন পাঁচ বছরের জন্য বৈধ থাকে, যার পরে রিনিউ করতে হয়।
প্রথমবারের মতো ধর্মীয় কার্যকলাপের একটি সুস্পষ্ট তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে
প্রথমবারের মতো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ধর্মীয় উদ্দেশ্যে অনুমোদিত কার্যকলাপের একটি বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করেছে। বিদেশি অনুদান এখন থেকে শুধুমাত্র সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ধর্মীয় কার্যকলাপের জন্যই ব্যবহার করা যাবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এই কার্যকলাপের তালিকায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করেছে।
সরকার বলছে, এই কার্যক্রমগুলোর একটি সুস্পষ্ট তালিকা থাকলে বিদেশি তহবিল কোথায় ব্যবহার করা যাবে এবং কোথায় যাবে না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
ধর্ম পরিবর্তন সংক্রান্ত কার্যকলাপের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা
নতুন নিয়মাবলীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ধর্ম পরিবর্তন সংক্রান্ত কার্যকলাপের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক স্পষ্ট করেছে, যে কোনও ধরনের ধর্ম পরিবর্তন কার্যকলাপের জন্য বিদেশি তহবিল ব্যবহার করা যাবে না। তবে, ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান, ধ্যান শিবির, সৎসঙ্গ এবং ধর্মোপদেশের মতো কার্যকলাপের অনুমতি থাকবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক স্পষ্ট করেছে, কোনও ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে প্ররোচিত, উৎসাহিত বা সহায়তা করে এমন কার্যকলাপ নিষিদ্ধ থাকবে। সরকার মনে করে, এর মাধ্যমে বিদেশি তহবিলের অপব্যবহার রোধ করা যাবে এবং ধর্মীয় কার্যকলাপের ছদ্মবেশে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড দমন করা সম্ভব হবে।
'কি ফাংশানারি'-র নতুন সংজ্ঞা
সংশোধিত বিধিমালায় "প্রধান কর্মকর্তা" পরিভাষাটির একটি নতুন সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন থেকে হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের (HUFs) পরিচালক, ট্রাস্টি, অংশীদার, পদাধিকারী, কর্তা, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য এবং কোনও প্রতিষ্ঠানের শাসন ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জবাবদিহির আওতাভুক্ত হবেন। এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হল, যেকোনও প্রতিষ্ঠানের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও ব্যবস্থাপকদের সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা এবং নিয়ম লঙ্ঘিত হলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
রেজিস্ট্রেশনের উদ্দেশ্য ও পরিধি উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক
এখন, FCRA রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদনকারী প্রতিটি সংস্থাকে অবশ্যই স্পষ্টভাবে জানাতে হবে:
কী উদ্দেশ্যে এটি বিদেশি তহবিল গ্রহণ করতে চায়।
এবং কোন কোন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এটি তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
সংস্থাগুলোকে সরকার-নির্ধারিত একটি তালিকা থেকে তাদের উদ্দেশ্যসমূহ নির্বাচন করতে হবে। যেসব সংস্থা ইতিমধ্যে রেজিস্টার্ড, তাদেরও এক বছরের মধ্যে তাদের কার্যক্রম ও কাজের পরিধি সম্পর্কে তথ্য সরকারের কাছে জমা দিতে হবে। এর ফলে সরকার বুঝতে পারবে কোন সংস্থা কোন উদ্দেশ্যে এবং দেশের কোন অংশে বিদেশি তহবিল ব্যবহার করছে।
বিদেশী নাগরিকদের বিষয়ে কঠোরতা
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভারতীয় বংশোদ্ভূত নন এমন বিদেশী নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা সংস্থাগুলিকে সাধারণত এফসিআরএ (FCRA) রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হবে না। তবে, বিশেষ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার এই ধরনের ক্ষেত্রে অনুমতি দিতে পারে। সরকার মনে করে এই বিধানটি জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিদেশী প্রভাব নিয়ন্ত্রণের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বৈদেশিক তহবিলের পরবর্তী কিস্তির জন্য নতুন শর্তাবলী
এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনও সংস্থা এখন থেকে বৈদেশিক তহবিলের দ্বিতীয় বা পরবর্তী কিস্তি তখনই পাবে, যদি তারা পূর্বে প্রাপ্ত তহবিলের কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ ব্যবহার করে থাকে। এর জন্য সংস্থাটিকে নিম্নলিখিত নথিগুলো জমা দিতে হবে:
সরকারের লক্ষ্য হল এটা নিশ্চিত করা, বিদেশি তহবিল যেন দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাকাউন্টে পড়ে না থাকে এবং যে উদ্দেশ্যে তা অনুমোদন করা হয়েছে, সেই উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়।
সামাজিক মাধ্যম ও প্রকাশনা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক
সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী এনজিও এবং অন্যান্য সংস্থাগুলোকে এখন তাদের নিম্নলিখিত বিষয়গুলো প্রকাশ করতে হবে:
এই তহবিলগুলো সম্পর্কিত তথ্যও সরকারকে প্রদান করতে হবে। সরকার মনে করে, এর ফলে বিদেশি তহবিল গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।
ফি ব্যবস্থায় পরিবর্তন
সরকার নিবন্ধন ফি ব্যবস্থাও সংশোধন করেছে। যদি কোনও সংস্থা একাধিক রাজ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করতে বা একাধিক উদ্দেশ্যে রেজিস্টার করতে চায়, তবে তাদের অতিরিক্ত ফি দিতে হতে পারে। এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হল সংস্থাগুলোকে তাদের কার্যক্রমের পরিধি ও উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে উৎসাহিত করা।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, এই পরিবর্তনগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য হল বৈদেশিক অর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুসংহত করা এবং ধর্মীয়, শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক খাতে অনুমোদিত কার্যক্রমের সুস্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাস নিশ্চিত করা। সরকার মনে করে, বিদেশি তহবিল সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত এবং প্রতিটি টাকার হিসাব থাকা আবশ্যক। এতে জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক সম্প্রীতি ও জনস্বার্থও জোরদার হবে।
এই পরিবর্তনগুলোর প্রভাব কী হবে?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নতুন নিয়মগুলো বহু স্তরে প্রভাব ফেলবে।
ধর্মীয় সংগঠনগুলোর কার্যকলাপে স্বচ্ছতা আসবে।
বিদেশি তহবিলের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার হবে।
এনজিওগুলোর জবাবদিহিতা বাড়বে।
বিদেশি তহবিলের অপব্যবহারের সম্ভাবনা হ্রাস পাবে।
এটি ধর্ম পরিবর্তন সংক্রান্ত বিবাদ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেকর্ড, নথি এবং ডিজিটাল তথ্য রক্ষণাবেক্ষণের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত নিয়মকানুন পালনের বোঝা বহন করতে হতে পারে।
এফসিআরএ সংশোধনী বিধিমালা, ২০২৬, বিদেশি অর্থায়ন ব্যবস্থার একটি বড় সংস্কার। সরকার ধর্মীয় কার্যকলাপের একটি সুস্পষ্ট তালিকা প্রকাশ করেছে, ধর্ম পরিবর্তন সংক্রান্ত কার্যকলাপের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করেছে, সামাজিক মাধ্যম ও প্রকাশনা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে এবং বিদেশি তহবিল ব্যবহারের উপর নতুন শর্ত আরোপ করেছে।
এই পরিবর্তনগুলো সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় ভবিষ্যতে, বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী সংস্থাগুলোকে আরও বেশি স্বচ্ছতা, উন্নততর নথিপত্র এবং কঠোরতর পরিপালন মানদণ্ড মেনে চলতে হবে। সরকারের দাবি, এর ফলে বিদেশি অর্থায়ন ব্যবস্থা আরও জবাবদিহিমূলক, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল হবে এবং ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রমে বিদেশি তহবিলের ব্যবহারের ওপর কার্যকর তদারকি নিশ্চিত হবে।