আজ ফের পথে 'আরশোলারা'দিল্লিতে শনিবারের ব্যাপক পুলিশি অভিযানের পরেও আন্দোলন থামবে না, এমনটাই জানিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)। রবিবার, ১১ অক্টোবর ফের যন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দিয়েছে 'আরশোলারা'। এদিকে, দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দুই সহ আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে দিল্লি পুলিশ আটক করার পর থেকেই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না দল। শনিবার ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁদের বিমান অবতরণের কিছুক্ষণের মধ্যেই আটক করা হয়। CJP-র দাবি, ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাঁদের কোনও হদিশ নেই। তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কেও কিছু জানে না CJP।
শীর্ষ নেতৃত্ব আটক থাকায় আন্দোলনের দায়িত্ব নেন CJP নেতা অজিঙ্কা শিন্ডে। তিনিই রবিবার সকাল ১০টায় যন্তর মন্তরে ফের জমায়েতের ঘোষণা করেন। জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতেই এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।
শনিবারের বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড় চালায় পুলিশ। ৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয় বলে জানা গিয়েছে। আন্দোলন আটকাতে রাজধানীজুড়ে জারি করা হয় একাধিক নিরাপত্তা বিধিনিষেধ।
দিল্লিতে ২০ হাজারের বেশি পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন
নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কার কথা জানিয়ে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। রাজধানীজুড়ে ২০ হাজারেরও বেশি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর কর্মী মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে যন্তর মন্তর সংলগ্ন স্পর্শকাতর এলাকায় মোতায়েন ছিলেন প্রায় সাড়ে ৬ হাজার নিরাপত্তাকর্মী।
বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয় ব্যারিকেড ও চেকপয়েন্ট। পাশাপাশি তৈরি করা হয় আটক কেন্দ্র এবং নজরদারির জন্য বিশেষ সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়। কনট প্লেসে জমায়েত হওয়া প্রায় ১৫০ জনকে আটক করে পুলিশ। অপরাধমূলক অতীত রয়েছে, এমন ৬০০-রও বেশি মানুষকেও আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আটক করা হয়।
মেট্রো ও ট্রেন পরিষেবায় প্রভাব
নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে দিল্লির সাধারণ পরিবহণ পরিষেবা ও যান চলাচলও ব্যাহত হয়। বন্ধ রাখা হয় একাধিক মেট্রো স্টেশন। বাতিল করা হয় ট্রেন পরিষেবাও। জনপথ- কর্তব্যপথ এলাকার চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ রাখা হয়।
দিল্লি-নয়ডা সীমান্তের চিল্লা সীমান্ত সহ একাধিক জায়গায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন রাস্তায় চেকপয়েন্ট ও যান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে তৈরি হয় যানজট। তবে রাত ১০টার পর দিল্লি মেট্রোর সমস্ত স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থানের দরজা খুলে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলিতে ইন্টারচেঞ্জ পরিষেবাও স্বাভাবিক করা হয়।
নিরাপত্তার কারণে শনিবার বন্ধ থাকা কনট প্লেসের বাজার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রবিবার, ১১ অক্টোবর থেকে ফের খুলে দেওয়ার কথা। ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার এবং দোকান খোলার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছে নিউ দিল্লি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন (NDTA)।
আটক বিরোধী নেতারাও
এই বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার সময় একাধিক বিরোধী দলের নেতাকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পিনারাই বিজয়ন এবং মানিক সরকার।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে বাধা দেওয়ার পর তাঁকে এবং মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যান্য নেতাদের পুলিশ গাড়িতে করে সরিয়ে নিয়ে যায়। তিনি আরও জানান, দিল্লিতেই থাকবেন এবং বিরোধীদের পরিকল্পিত আন্দোলনে অংশ নেবেন।
পুলিশের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা। রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, সরকার বিক্ষোভকারী ও বিরোধী নেতাদের নিশানা করছে। অন্যদিকে, রাজধানীজুড়ে জারি করা বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। দিল্লিতে আটক নেতাদের মুক্তি না দিলে অনির্দিষ্টকালের অনশন অথবা পদযাত্রার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। এই ধরপাকড়কে 'অঘোষিত জরুরি অবস্থা' বলে উল্লেখ করে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের আদর্শের কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর প্রতি রাহুল গান্ধী ও বিরোধী সাংসদদের আচরণের সমালোচনা করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাও আন্দোলনের সমালোচনা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য দিল্লি পুলিশের প্রশংসা করেছেন।
আইনজীবীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ
আটক বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়ে মহেন্দ্র পার্ক থানার বাইরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন কয়েকজন আইনজীবী। পরে তাঁরা ছত্রশাল স্টেডিয়ামে যান। সেখানে বেশ কয়েকজন আটক ব্যক্তিকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু স্টেডিয়ামের মূল ফটকেই তাঁদের আটকে দেওয়া হয়।
এদিকে, বিক্ষোভকারী, রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের গণহারে আটকের খবর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার দফতর। রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক মুখপাত্র থামিন আল-খিতান কর্তৃপক্ষকে শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার রক্ষা করার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও বিধিনিষেধ জারি করা হলে তা প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার শর্ত পূরণ করতে হবে।
রবিবার বিশেষ শুনানি সুপ্রিম কোর্টে
শনিবারের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক আবেদনের শুনানির জন্য রবিবার বিশেষ বেঞ্চ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। একটি আবেদনে বিরোধী নেতা ও বিক্ষোভকারীদের আটক করার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, একটি পৃথক আদালত অবমাননার আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ৯ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ মেট্রো স্টেশন বন্ধ রেখেছে এবং ট্রেন পরিষেবা বাতিল করেছে। ওই নির্দেশে গণপরিবহণ সম্পূর্ণ বন্ধ না করার কথা বলা হয়েছিল বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, দিল্লি পুলিশ আইনে আটক প্রায় ৩ হাজার মানুষকে শনিবার সন্ধ্যায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে CJP-র আটক তিন শীর্ষ নেতার বিষয়ে এখনও কোনও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
দিল্লির বাইরেও ছড়াল বিক্ষোভ
CJP-র আন্দোলনের আঁচ শুধু দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দলটির দাবির সমর্থনে মুম্বই ও বেঙ্গালুরুতেও বিক্ষোভ দেখান আন্দোলনকারীরা। মুম্বইয়ে অগাস্ট ক্রান্তি ময়দানে আয়োজিত বিক্ষোভ থেকে প্রায় ৪০০ জনকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন অভিনেতা ইমরান খানও। তাঁর বিক্ষোভে অংশগ্রহণ নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন প্রাক্তন BJP সাংসদ কিরীট সোমাইয়া। বেঙ্গালুরুর রাস্তাতেও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এবং CJP-র দাবির সমর্থনে বিক্ষোভ দেখান আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি যাতে আরও উত্তপ্ত না হয়ে ওঠে, সে জন্য পুলিশ পদক্ষেপ করে।
সব মিলিয়ে, শনিবারের ব্যাপক ধরপাকড়ের পরেও রবিবার ফের যন্তর মন্তরে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে CJP। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে বিভিন্ন রাস্তায় যান চলাচল ঘুরিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে ট্র্যাফিক অ্যাডভাইজরি জারি করেছে দিল্লি পুলিশ।