‘হোমমেকার নয়, দেশের নির্মাতা’, গৃহিণীদের পারিশ্রমিক মাসে অন্তত ৩০ হাজার টাকা, বলল সুপ্রিম কোর্ট

বিচারপতি সঞ্জয় করোলের বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে জানায়, গৃহিণীরা যে শ্রম, সময় ও দক্ষতা পরিবারের জন্য ব্যয় করেন, তার অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম। তাঁরা পরিবারের ভিত্তিকে শক্তিশালী করেন, সন্তানদের লালন-পালন করেন এবং সমাজের অগ্রগতিতে নীরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আদালতের ভাষায়, “হোমমেকার নয়, তাঁদের দেশের নির্মাতা বলা উচিত।”

Advertisement
‘হোমমেকার নয়, দেশের নির্মাতা’, গৃহিণীদের পারিশ্রমিক মাসে অন্তত ৩০ হাজার টাকা, বলল সুপ্রিম কোর্ট
হাইলাইটস
  • সংসার সামলানো মহিলাদের শুধুমাত্র ‘হোমমেকার’ বা গৃহিণী হিসেবে চিহ্নিত করা তাঁদের অবদানের প্রতি অবিচার।
  • এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

সংসার সামলানো মহিলাদের শুধুমাত্র ‘হোমমেকার’ বা গৃহিণী হিসেবে চিহ্নিত করা তাঁদের অবদানের প্রতি অবিচার। এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের মতে, তাঁরা শুধু ঘরের কাজই করেন না, একটি পরিবারকে ধরে রাখেন, সন্তানদের মানুষ করে তোলেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলে দেশ নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই তাঁদের ‘হোমমেকার’ নয়, বরং ‘জাতি নির্মাতা’ বা ‘দেশের নির্মাতা’ বলা উচিত।

এই মন্তব্য উঠে এসেছে ২০০১ সালে পঞ্জাবে এক গৃহবধূর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মামলার শুনানিতে। দুর্ঘটনায় নিহত মহিলার পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর গৃহস্থালি শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যায়নের বিষয়টি সামনে আনে। প্রথমে মোটর অ্যাকসিডেন্ট ক্লেম ট্রাইবুনাল ২.৪২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেছিল। পরে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট সেই অঙ্ক বাড়িয়ে ৮.৪ লক্ষ টাকা করে। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৬২.৭৮ লক্ষ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

বিচারপতি সঞ্জয় করোলের বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে জানায়, গৃহিণীরা যে শ্রম, সময় ও দক্ষতা পরিবারের জন্য ব্যয় করেন, তার অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম। তাঁরা পরিবারের ভিত্তিকে শক্তিশালী করেন, সন্তানদের লালন-পালন করেন এবং সমাজের অগ্রগতিতে নীরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আদালতের ভাষায়, “হোমমেকার নয়, তাঁদের দেশের নির্মাতা বলা উচিত।”

বিবাহিত জীবনে নারীর ভূমিকা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, “বিয়ে মানে পরিচারিকা নিয়োগ নয়।” সংসারের দায়িত্ব স্বামী-স্ত্রী উভয়ের। কোনও মহিলা বিবাহিত হলেই তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা, স্বপ্ন বা পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিতে বাধ্য নন। সন্তান প্রতিপালনের পাশাপাশি নিজের কর্মজীবনে এগিয়ে যেতে চাইলে সেটিকে কখনও স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির প্রতি ‘নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে দেখা যায় না।

সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে, গৃহিণীদের অসংখ্য ত্যাগ ও পরিশ্রম সমাজে প্রায়শই অদৃশ্য থেকে যায়। তাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে বছরের পর বছর পরিবারকে সেবা দিয়ে যান। তাই তাঁদের শ্রমের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য স্বীকার করা জরুরি। আদালতের মতে, গৃহস্থালির কাজে তাঁদের অবদান পারিবারিক সম্পত্তির উপর তাঁদের ন্যায্য অধিকারকেও শক্তিশালী করে।

Advertisement

এই মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকাও দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় কোনও গৃহবধূর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে গৃহস্থালি শ্রমের ন্যূনতম মাসিক মূল্য ৩০ হাজার টাকা ধরে হিসাব করা যেতে পারে। কারণ একজন গৃহিণীর কাজ শুধুমাত্র রান্নাবান্না বা ঘর পরিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

পাশাপাশি দেশের সমস্ত হাই কোর্টকে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দ্রুত মঞ্জুর করার বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের মতে, ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির দ্রুত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

 

POST A COMMENT
Advertisement