
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের প্রভাব যাতে ভারতের জ্বালানি সরবরাহে বড় সঙ্কট তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করতে তৎপর হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই পরিস্থিতিতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিভিন্ন মন্ত্রককে সমন্বয় রেখে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব যেন দেশের সাধারণ নাগরিকদের জীবনে ন্যূনতম পড়ে এবং সম্ভাব্য যেকোনও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকে।
আরব দুনিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে দেশে এলপিজি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় মঙ্গলবার একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বৈঠকে মূলত এলপিজি সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। সরকারের প্রধান লক্ষ্য, দেশের সাধারণ গ্রাহকদের ওপর যেন জ্বালানি সংকটের প্রভাব না পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী অচল হয়ে পড়া। আমেরিকা, ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলা সামরিক সংঘাতের প্রভাবেই এই পথ বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত তার মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬২ শতাংশ আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ এলপিজি পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে আসে, যার বড় অংশই আসে সৌদি আরব সহ ওই অঞ্চলের দেশগুলি থেকে এবং তা হরমুজ প্রণালী দিয়েই ভারতে পৌঁছায়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি দেশের বর্তমান মজুতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বছরে প্রায় ৩১.৩ মিলিয়ন টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ ব্যবহার হয় গৃহস্থালির রান্নার গ্যাস হিসেবে, আর বাকি ১৩ শতাংশ ব্যবহার করে হোটেল, রেস্তরাঁ এবং বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান।
সরকার সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় গৃহস্থালি গ্যাস সরবরাহকেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাজারদরের সিলিন্ডার ব্যবহার করা বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ঘাটতির আশঙ্কা বেশি। ইতিমধ্যেই মুম্বই এবং সহ একাধিক বড় শহরে হোটেল ও রেস্তরাঁ শিল্পে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
সংকট মোকাবিলায় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক দেশের রিফাইনারিগুলিকে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে মজুতদারি ও কালোবাজারি রোধে গৃহস্থালি গ্রাহকদের জন্য এলপিজি রিফিল বুকিংয়ের সময়সীমা ২১ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো জরুরি পরিষেবার জন্য আলাদা করে গ্যাস বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তেল বিপণন সংস্থাগুলির শীর্ষ আধিকারিকদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি প্রয়োজন, অগ্রাধিকার এবং মজুত পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এলপিজি বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেবে। সরকার আশা করছে, উৎপাদন বৃদ্ধি ও সঠিক বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।