সিয়া ও কেতন, হুডি পরে ওটা কে? পুনের ঐতিহাসিক লৌহগড় দুর্গে ট্রেকিং করতে গিয়ে ২৬ বছরের ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালের মৃত্যুকে প্রথমে দুর্ঘটনা মনে করা হলেও তগন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর খুনের অভিযোগ। গোটা ঘটনার রহস্যভেদে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে একটি CCTV ফুটেজ। যেখানে একট হুডি পরা যুবককে দেখা গিয়েছে।
পুলিশ সত্রে খবর, গত ১৮ জুন কেতন তাঁর ২০ বছরের বাগদত্তা সিয়া গোয়ালের সঙ্গে লৌহগড় দুর্গে যান। দুর্গের টিকিট কাউন্টারের কাছে থাকা CCTV ক্যামেরায় দেখা গিয়েছে, তাঁদের পিছু নিচ্ছেন এক ব্যক্তি। যিনি পরে চেতন চৌধুরী বলে চিহ্নিত হন। ওই যুবককে শর্টস ও হুডি পরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখা গিয়েছে। শুধু তাই নয়, হুডিটি এতটাই নীচে নামানো ছিল যে তাঁর মুখ স্পষ্ট দেখা যাচঅছিল না। মাথায় ছিল হেডসেটও।
তদন্তকারী এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, CCTV ফুটেজ বিশ্লেষণের সময়ই তাঁদের সন্দেহ হয়। কারণ ওই দিন তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এত গরমে কেউ কেন মুখ ঢেকে হুডি পরে থাকবে, তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। আরও একটি ফুটেজে দেখা যায়, সিয়া হঠাৎ পিছনে তাকাচ্ছেন এবং ঠিক সেই সময় হুডি পরা ব্যক্তি আচমকা বসে পড়ছেন।

তদন্তে জানা গিয়েছে, চেতন ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের মোবাইল ফোন দোকানে রেখে গিয়েছিলেন যাতে তাঁর অবস্থান ট্র্যাক করা না যায়। পরিবর্তে তিনি এক কর্মীর ফোন সঙ্গে নিয়ে যান। এছাড়া, ঘটনার দিন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত তাঁর ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ ছিল। এই তথ্য তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে।
পুলিশের দাবি, দুর্গের এক বিপজ্জনক খাদ সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছনোর পর পিছন দিক থেকে কেতন ও সিয়ার কাছে যান চেতন। এরপর প্রায় ৪০০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যান কেতন। পরে সিয়া পুলিশকে ফোন করে জানান, ছবি তুলতে গিয়ে প্রবল হাওয়ার কারণে দুর্ঘটনাবশত এমনা ঘটে। সেই বয়ানের ভিত্তিতে প্রথমে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মামলা রুজু করা হয়েছিল।
পরের দিন, ১৯ জুন দুর্গম এলাকা থেকে উদ্ধার হয় কেতনের দেহ। তদন্তে নেমে পুলিশ কেতন, সিয়া ও চেতনের কল রেকর্ড খতিয়ে দেখে। তদন্তকারীদের দাবি, সিয়া ও চেতনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁদের মধ্যে হাজার হাজার ফোনকল এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার তথ্য পাওয়া যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার ছবি দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয় CCTV-তে দেখা হুডি করা যুবকই চেতন।
পুলিশের অনুমান, কেতনের সঙ্গে বিয়ে করতে রাজি ছিলেন না সিয়া। তবে পরিবার ও সমাজের সম্মানের কথা ভেবে তিনি বিয়ে ভাঙতেও চাননি বা চেতনের সঙ্গে পালিয়ে যেতে রাজি ছিলেন না। সেই কারণেই কেতনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
তদন্তে আরও জানা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কেতন ও সিয়ার বাগদান হয়েছিল। আগামী নভেম্বরে উদয়পুরে তাঁদের বিয়ের আয়োজনও করা হয়েছিল। তবে কেতনের পরিবারের দাবি, সিয়া বিয়ে পিছিয়ে দেওয়ার কথাও তুলেছিলেন। পাশাপাশি, সিয়া বারবার কেতনকে লৌহগড় দুর্গে নিয়ে যেতে চাইতেন। ৩১ মে একবার সেখানে গিয়েছিলেন তাঁরা। ৪ জুন আবার যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও কেতনের মা তাঁকে যেতে বাধা দেন। পুলিশের দাবি, ১৪ জুনও সিয়া নাকি কেতনকে খাদে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সে সময় কেতন একটি ঝোপ ধরে বেঁচে যান। পরে সিয়া সাপ দেখার অজুহাত দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। শেষ পর্যন্ত, ১৮ জুন পরিকল্পনা সফলভাবে কার্যকর করা হয়।
সিয়া গোয়াল এবং ২২ বছরের চেতন চৌধুরী যৌথভাবে পরিকল্পনা করে কেতন আগরওয়ালকে খুন করেছেন। পুলিশের ধারণা এমনটাই। জিজ্ঞাসাবাদের সময় দু'জনেই নিজেদের ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
২৬ বছর বয়সি কেতন আগরওয়ালের এই অকাল ও আকস্মিক মৃত্যু এবং তার পরে তদন্তে যা বেরিয়ে এসেছে, তা জেনে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে তাঁর পরিবার। ক্ষুব্ধ বাবা বলেন, 'যদি সিয়া বিয়ে করতে না-ই চাইচ তবে সহজেই না করে দিত পারত। আমরাও তৎক্ষণাৎ বিয়ে বাতিল করে দিতাম। এত বড় পদক্ষেপের কী দরকার ছিল? এরা কতটা নিষ্ঠুর মানসিকতার যে একটা ২৬ বছরের ছেলেকে খুন করে ফেলল!' কেতনের মায়ের গলাতেও এখন শুধুই ক্ষোভ আর হতাশার সুর। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে আর নেই। সিয়া আর ওর প্রেমিকই এর জন্য পুরোপুরি দায়ী। মেয়েটা আমাদের সঙ্গে দিনের পর দিন ছলনা করেছে।’ অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড অর্থাৎ, ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন তিনি।