আমেরিকায় বাড়ছে বর্ণবাদ, ভারতীয়দের ‘চাকরি চোর’ বলে দাগানো হচ্ছে।-প্রতীকী ছবিমার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষ দ্রুত বেড়ে চলেছে। শুধু অভিবাসী ভারতীয়রাই নয়, তাঁদের নিয়োগকারী আমেরিকান সংস্থাগুলিও ক্রমশ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের H-1B দক্ষ কর্মী ভিসা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কঠোর হওয়ার পর থেকেই এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লজিস্টিক, খুচরো বাণিজ্য ও টেলিকম সেক্টরের একাধিক বড় মার্কিন সংস্থা, যেমন ফেডএক্স, ওয়ালমার্ট ও ভেরাইজন, এখন সংগঠিত অনলাইন ট্রোলিং, বর্ণবাদী গালিগালাজ, হুমকি এবং বয়কটের ডাকের মুখে পড়ছে। অভিযোগ তোলা হচ্ছে, এই সংস্থাগুলি নাকি আমেরিকান কর্মীদের বাদ দিয়ে ভারতীয়দের চাকরি দিচ্ছে।
‘ভারতীয় দখল’ তত্ত্বের উত্থান
আগে যেখানে বিতর্ক সীমাবদ্ধ ছিল অভিবাসন নীতি ঘিরে, এখন তা সরাসরি সংস্থাগুলিকে নিশানা করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে ‘ইন্ডিয়ান টেকওভার’ বা ‘ভারতীয় দখল’ তত্ত্ব। বহু পোস্টে ভারতীয়দের ‘চাকরি চোর’, ‘ভিসা প্রতারক’ বলে কটাক্ষ করা হচ্ছে, কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
ফেডএক্সকে ঘিরে বিতর্ক
ফিনান্সিয়াল টাইমস একটি ঘটনার উল্লেখ করেছে, গত বছর ফেডএক্সের একটি গাড়ি দুর্ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ঘটনাকে সংস্থার ভারতীয় বংশোদ্ভূত সিইও রাজ সুব্রহ্মণ্যমের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। কিছু পোস্টে লেখা হয়, 'আমাদের মহান আমেরিকান কোম্পানিগুলির ভারতীয় দখল বন্ধ করুন।'
ডানপন্থী সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী ও গ্যাব প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রু টরবা দাবি করেন, ফেডএক্স নাকি শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান কর্মীদের ছাঁটাই করে তাঁদের জায়গায় ভারতীয়দের নিয়োগ করছে।
ফেডএক্সের কড়া জবাব
এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে ফেডএক্স। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, গত ৫০ বছর ধরে তারা কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ করে আসছে। বিবৃতিতে বলা হয়, 'আমাদের কর্মীবাহিনী ২২০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে আমরা যে বৈচিত্র্যময় গ্রাহকদের পরিষেবা দিই, তারই প্রতিফলন।'
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়
অনলাইন চরমপন্থা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলির মতে, এগুলি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট-এর নির্বাহী পরিচালক রাকিব নায়েক জানিয়েছেন, ভারতীয়-আমেরিকান ব্যবসায়ী ও আধিকারিকদের বিরুদ্ধে এখন ‘সংগঠিত ঘৃণার প্রচার’ চলছে। তাঁর দাবি, গত এক বছর ধরেই ভারতীয়দের ‘জব স্টিলার’ ও ‘ভিসা স্ক্যামার’ বলে টার্গেট করা হচ্ছে।
স্টপ এএপিআই হেট ও মুনশট-এর তথ্য উদ্ধৃত করে ফিনান্সিয়াল টাইমস জানাচ্ছে, নভেম্বর মাসে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি ১২ শতাংশ বেড়েছে এবং অনলাইনে বর্ণবাদী গালিগালাজ ৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন H-1B ভিসা নিয়মে বড়সড় পরিবর্তনের ঘোষণা করার পর থেকেই এই বিদ্বেষ তীব্র হয়েছে। নতুন নিয়মে ১ লক্ষ ডলার ফি, বেতনভিত্তিক অগ্রাধিকার এবং সর্বোচ্চ বেতনপ্রাপ্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এই পদক্ষেপ আমেরিকান কর্মীদের সুরক্ষার জন্য।
‘প্রজেক্ট ফায়ারওয়াল’ ও আতঙ্কের পরিবেশ
এইচ-১বি নিয়োগে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ‘প্রজেক্ট ফায়ারওয়াল’ চালু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বেনামী সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে ওয়ালমার্ট, ভেরাইজন, ডিশ নেটওয়ার্কের মতো সংস্থার কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও লেখা হয়েছে, 'ভারতীয় গ্রিন কার্ড ম্যানেজারদের দেশছাড়া করুন।' মানবাধিকার সংস্থাগুলি সতর্ক করেছে, এই ধরনের ভাষা বাস্তব হিংসাকে উসকে দিতে পারে।
কেন ভারতীয়রাই মূল নিশানায়?
ফিনান্সিয়াল টাইমসের মতে, আমেরিকায় H-1B ভিসাধারীদের ৭১ শতাংশই ভারতীয়। প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাপ্লাই চেনের মতো খাতে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় পেশাদারদের উপর নির্ভরশীল মার্কিন অর্থনীতি। সেই কারণেই ভারতীয় কর্মী ও তাঁদের নিয়োগকারী সংস্থাগুলি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
গুগলের সুন্দর পিচাই, মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলার মতো শীর্ষ ভারতীয় বংশোদ্ভূত সিইওরাও এই ঘৃণার বাইরে নন।
প্রতিবাদ ও নীরবতা
ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ রাজনীতিক বিবেক রামস্বামী এই মানসিকতার তীব্র নিন্দা করে বলেছেন, 'কে বেশি আমেরিকান আর কে কম, এই ধারণাই অ-আমেরিকান।'
তবে রাজনৈতিক চাপের কারণে বহু সংস্থা প্রকাশ্যে বর্ণবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চাইছে না। এমনকি দীপাবলির মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও সমর্থন কমিয়ে দিচ্ছে অনেকে।
লন্ডনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগের বিশ্লেষক সিদ্ধার্থ ভেঙ্কটরামকৃষ্ণান মন্তব্য করেছেন, ভারতীয়রা এখন সংকীর্ণ, জাতিকেন্দ্রিক অভিবাসন আখ্যানের শিকার। তাঁর কথায়, 'এই লড়াই আসলে আমেরিকার আত্মা নিয়েই।'