
ভারত-পাকিস্তান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝখানে পড়ে কার্যত ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে গুজরাটের রাজকোটের এক সাধারণ পরিবার। ভিসা সংক্রান্ত জটিলতায় গত তিন বছর ধরে পাকিস্তানের করাচিতে আটকে রয়েছেন রেহানা। স্বামী পরভেজ শেখ ও দুই ছোট সন্তান রয়েছেন ভারতে। সীমান্তের কাগজপত্রের গেরোয় আটকে থাকা এই পরিবার এখন প্রতিদিন অপেক্ষা করছে একটাই খবরের, কবে একসঙ্গে থাকা যাবে।
রাজকোটের বাসিন্দা পরভেজ শেখ পেশায় এসি মেকানিক। ২০১৫ সালে করাচির বাসিন্দা রেহানার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। নিকাহ উপলক্ষে রেহানার পরিবার পাকিস্তান থেকে রাজকোটে আসে। বিয়ের পর সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভারতীয় ভিসায় স্বামীর সঙ্গে রাজকোটেই থাকতে শুরু করেন রেহানা। দাম্পত্য জীবন ছিল স্বাভাবিক। এই সময়েই তাঁদের দুই সন্তানের জন্ম হয় ভারতে। নিয়মিত ভিসা এক্সটেনশন হচ্ছিল, কোনও সমস্যাও ছিল না।
২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে ভিসা নবীকরণের পরামর্শ দেওয়া হয় রেহানাকে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনেই তিনি পাকিস্তানে যান। সঙ্গে গিয়েছিলেন পরভেজ ও দুই সন্তানও। করাচিতে প্রায় আড়াই মাস ছিলেন তাঁরা। পরভেজ ও সন্তানদের ভিসা মাসে মাসে বাড়ানো হলেও রেহানার ভিসা নবীকরণ আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সন্তানদের নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন পরভেজ। রেহানা তখন থেকেই করাচিতে আটকে।
এরপর শুরু হয় একের পর এক দপ্তরের দরজায় ঘোরার পালা। প্রথমে রাজকোটের জেলাশাসকের দপ্তরে আবেদন জানান পরভেজ। সেখান থেকে তাঁকে দিল্লির পাকিস্তান দূতাবাসে যোগাযোগ করতে বলা হয়। সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এর মধ্যেই ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর পর ভারত–পাকিস্তান সীমান্ত কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। দূতাবাসের কাজও থমকে যায়। পাকিস্তান দূতাবাসের তরফে জানানো হয়, ইসলামাবাদের আপত্তি নেই, কিন্তু ভারতীয় অনুমোদন ছাড়া প্রক্রিয়া এগোনো সম্ভব নয়।
এই তিন বছরে সন্তানদের বড় হতে দেখার সুযোগও পাননি রেহানা। ছেলে এখন চার বছরের, মেয়ের বয়স আট। মেয়েটি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে, ছেলে শুরু করেছে স্কুল। পরভেজ কাজের সূত্রে বাইরে থাকায় সন্তানদের দেখাশোনা করছেন তাঁর বোন। অসুস্থ, শয্যাশায়ী মাকেও সামলাতে হচ্ছে একই সঙ্গে। বোনের বাড়িতেই এখন সংসার চলছে।
অন্যদিকে করাচিতে বসে সামাজিক মাধ্যমে বারবার আবেদন জানাচ্ছেন রেহানা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাও করেছেন তিনি। রেহানার প্রশ্ন, শুধুমাত্র পাকিস্তানের নাগরিক হওয়ার কারণেই কি তিনি নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন? তাঁর বক্তব্য, যেখানে বিয়ে হয়েছে, যেখানে সংসার গড়েছেন, সেই ভারতেই তিনি থাকতে চান।
পহেলগাম হামলার পর ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতির যে মানবিক মূল্য সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে, এই ঘটনা তারই এক বাস্তব উদাহরণ। কাগজের জটিলতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির মাঝে আটকে পড়ে এক পরিবার আজও অপেক্ষা করছে পুনর্মিলনের।