তিন নির্বাচন কমিশনার ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে যখন রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে, তখন নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতবিরোধের দাবি ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন সূত্রের দাবি, ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারির পর থেকে কমিশনের কোনও সিদ্ধান্তে কোনও নির্বাচন কমিশনার ভিন্নমত পোষণ করেননি। তিন সদস্যের কমিশন SIR-সহ সমস্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবেই নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই বক্তব্য সামনে এল দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি রিপোর্ট প্রকাশের কয়েক দিন পর। ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে SIR সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের অন্ধকারে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও আপত্তি তোলা হয়েছিল।
SIR নিয়ে ঠিক কী বিতর্ক?
SIR হল ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এর মূল উদ্দেশ্য মৃত, ভুয়ো, একই ব্যক্তির একাধিক নাম এবং ঠিকানা বদলে অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটারদের চিহ্নিত করা। একইসঙ্গে যোগ্য ভোটারদের নাম যাতে তালিকায় থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য।
কমিশন সূত্রের দাবি, SIR একটি আইনি ও দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা নতুন নাম যুক্ত করার কাজও বিকেন্দ্রীভূতভাবে বা ERO এবং AERO-দের স্তরে হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজে ব্যক্তিগতভাবে এই কাজ করেন না বলে জানিয়েছে কমিশন।
Form 6 নিয়ে কী বলছে কমিশন?
নতুন ভোটারদের নাম ভোটার তালিকায় যুক্ত করার জন্য Form 6 ব্যবহার করা হয়। এই ফর্মে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি বলে দাবি করেছে নির্বাচন কমিশন। অন্যদিকে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টে Form 6 নিয়ে কমিশনের দুই সদস্যের আপত্তির কথা উঠে এসেছিল। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত করার প্রক্রিয়া এবং ফর্মের পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টে SIR নিয়ে কী হয়েছে?
SIR নিয়ে আইনি প্রশ্নও উঠেছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্ট কখনও এই প্রক্রিয়া বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি। বরং ভোটারদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা রেখে SIR চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে কমিশনের দাবি। এই বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী নির্দেশকে ঘিরে অবশ্য আইনি বিতর্ক এখনও চলছে। SIR এবং নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদনও হয়েছে।
প্রায় ২৫ হাজার আধিকারিক নিয়ে কী দাবি কমিশনের?
নির্বাচন কমিশন সূত্রের দাবি, SIR প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২৫ হাজার ERO এবং AERO-র মধ্যে কেউ এই প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ করেননি। কমিশনের আরও বক্তব্য, ভোটার যাচাইয়ের জন্য BLO-দের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কোনও ভোটার বাড়িতে না থাকলে বা ঠিকানা বদলে ফেললে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিকবার বাড়িতে গিয়ে যাচাই করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
গোয়ার ৯৭ ভোটারের নাম নিয়ে কী হয়েছিল?
গোয়ায় ৯৭ জন ভোটারের নাম প্রথমে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় না থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছিল। নির্বাচন কমিশন সূত্রের দাবি, এর পিছনে ছিল প্রযুক্তিগত সমস্যা।
কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ৯৭ জনের মধ্যে ৮৮ জনের নাম পরে তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। তিনজনকে পর্তুগালের নাগরিক হিসেবে পাওয়া গিয়েছে এবং ছয়জন সেই সময়ে বিদেশে ছিলেন। বাকি মামলাগুলির যাচাই চলছে বলে দাবি কমিশনের।
বেলা এস্টেটের ৭২৭ ভোটার নিয়ে কী বলছে কমিশন?
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বেলা এস্টেটে ৭২৭ জন ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। কমিশন সূত্রের বক্তব্য, দিল্লিতে নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত করার প্রক্রিয়া এখনও চলছে। কমিশনের দাবি, বেলা এস্টেটে BLO-রা যখন যাচাই করতে গিয়েছিলেন, তখন সেখানে কেউ উপস্থিত ছিলেন না। ফলে কার কাছ থেকে স্বাক্ষর বা প্রয়োজনীয় যাচাই নেওয়া হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
নির্বাচন কমিশন সূত্র আরও জানিয়েছে, যে সমস্ত ভোটার SIR ফর্মে সই করে তা BLO-র কাছে জমা দিয়েছেন, তাঁদের নাম খসড়া ভোটার তালিকায় নিশ্চিত করা হবে।
১১ কোটি ভোটারের নাম ফেরানোর দাবি
SIR নিয়ে প্রায় ১১ কোটি ভোটারের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় যুক্ত করার দাবিও উঠেছে। এ বিষয়ে কমিশন সূত্রের ব্যাখ্যা, এর অর্থ হবে যাচাইয়ের সময় যেসব নাম বাদ গিয়েছিল, কিন্তু যেগুলির পুনরায় যাচাই এখনও শেষ হয়নি, সেই নামগুলি ফেরানো। অর্থাৎ, নাম বাদ পড়া এবং চূড়ান্তভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে যাওয়ার বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয় বলে কমিশন সূত্রের বক্তব্য।
তাহলে মতবিরোধের প্রশ্নে অবস্থান কী?
এই মুহূর্তে দুটি ভিন্ন বক্তব্য সামনে রয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্তে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী SIR সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে কমিশনের কোনও সিদ্ধান্তে কোনও কমিশনার ভিন্নমত পোষণ করেননি এবং সমস্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ছিল।
ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন শুধু SIR-এর নিয়ম নয়, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং দুই ধরনের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্যও উঠে এসেছে।