রাহুল গান্ধী ও সুপ্রিম কোর্ট সুপ্রিম কোর্টকে ধমকানো বা বিচারব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না। বৃহস্পতিবার অবস্থান স্পষ্ট করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ১২ অক্টোবরের মিছিল নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে তাঁর আচরণের ব্যাখ্যা দিতে হবে বলে জানিয়ে দিলেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
অন্যদিকে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে ইন্ডিয়া ব্লক এবং AIMIM প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দায়ের করা আবেদনে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের জবাব চেয়েছে আদালত। পাশাপাশি, দিল্লিতে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংক্রান্ত মামলাগুলিতে CCTV ফুটেজ-সহ যাবতীয় ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশও দেয় শীর্ষ আদালত। এই শুনানিতে উঠে আসে তিনটি পৃথক বিষয়। সুপ্রিম কোর্টের কাছে রাজনৈতিক মিছিল ও প্রতিবাদ, SIR-এ ভোটারদের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ এবং বিক্ষোভের সময় পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে একাধিক আবেদন।
রাহুল গান্ধীকে কেন ব্যাখ্যা দিতে বলল সুপ্রিম কোর্ট?
১২ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী-সহ ইন্ডিয়া ব্লকের শীর্ষ নেতারা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ এবং SIR প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনের অংশ ছিল এই কর্মসূচি। বৃহস্পতিবার সেই ঘটনা নিয়েই প্রশ্ন তুলল শীর্ষ আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিব্বলকে বলেন, রাহুল গান্ধীকে তাঁর আচরণের ব্যাখ্যা দিতে হবে। রাহুলের হয়ে আদালতে সওয়াল করছিলেন সিব্বল। শুনানিতে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য, 'কেউ বিচারব্যবস্থাকে ধমকাতে পারে না।'
এই মন্তব্যের তাৎপর্য হল, রাজনৈতিক দাবি বা প্রতিবাদের নামে বিচারব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করা যায় না। আদালতের সামনে কোনও বিষয়ে আবেদন জানানো এবং রাজনৈতিক মিছিলের মাধ্যমে আদালতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা- দুটিকে এক করে দেখা যায় না। তবে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে এই ঘটনায় চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন কথা প্রদত্ত তথ্য থেকে বলা যাচ্ছে না। আদালত আপাতত তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
'সুপ্রিম কোর্টকে ধমকানো যাবে না', কেন এই মন্তব্য?
শুনানিতে সিনিয়র আইনজীবী গৌরব ভাটিয়া আদালতের সামনে বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টকে রাজনৈতিক মিছিলের অংশ করে তোলা বা আদালতের উপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টে যা ঘটেছে, তা হওয়া উচিত ছিল না।
ভাটিয়া আরও জানান, প্রায় ২০০ জন আইনজীবী একটি স্মারকলিপিতে সই করেছেন। সেখানে আদালতকে ধমকানোর চেষ্টা বলে তাঁরা যা মনে করছেন, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের মূল কথা, বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে। কোনও রাজনৈতিক দল, নেতা বা আন্দোলনকারীর চাপের কাছে আদালত নতি স্বীকার করবে না। আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি থাকলে আইনি পদ্ধতিতে তার মোকাবিলা করতে হবে। প্রতিবাদ বা রাজনৈতিক কর্মসূচি যেন বিচারব্যবস্থার উপর চাপ তৈরির মাধ্যম না হয়ে ওঠে, সেই প্রশ্নই এই শুনানিতে সামনে এসেছে।
SIR নিয়ে রাহুল গান্ধী ও ইন্ডিয়া ব্লকের আবেদনে কী নির্দেশ?
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-কে ঘিরে একাধিক আবেদন জমা পড়েছে সুপ্রিম কোর্টে। ইন্ডিয়া ব্লকের দলগুলি এবং AIMIM প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসি এই সংক্রান্ত আবেদন করেছেন। তাঁদের আবেদনে ভোটার তালিকায় অনিয়ম এবং ভোটারদের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ-সহ বিভিন্ন বিষয় উত্থাপন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার এই আবেদনগুলিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের জবাব চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানিয়েছেন, SIR সংক্রান্ত আবেদনগুলি আগে থেকে বিচারাধীন মামলার সঙ্গে যুক্ত করে শোনা হবে। আদালতের বক্তব্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ২৪ ও ২৫ নম্বর আবেদনে নোটিস জারি করা হবে এবং সেগুলি মূল বিচারাধীন মামলার সঙ্গে শুনানি হবে।
অর্থাৎ, এই পর্যায়ে আদালত কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। SIR প্রক্রিয়া বাতিল করা বা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়েছে, এমন তথ্য এখানে নেই।
জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবি নিয়ে কী হল?
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবি বিরোধীদের আন্দোলনের অন্যতম বিষয়। ১২ অক্টোবর রাহুল গান্ধী-সহ ইন্ডিয়া ব্লকের নেতাদের মিছিলও এই বৃহত্তর প্রতিবাদের অংশ ছিল। বিরোধীরা SIR প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিও তুলেছেন।
তবে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের শুনানিতে আদালত জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের নির্দেশ দেয়নি। SIR সংক্রান্ত আবেদনগুলিতে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের জবাব চাওয়া হয়েছে এবং আবেদনগুলি বিচারাধীন মামলার সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দিল্লির বিক্ষোভের CCTV ফুটেজ সংরক্ষণের নির্দেশ
দিল্লির প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংক্রান্ত শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট সমস্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সংশ্লিষ্ট CCTV ফুটেজ এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। বেসরকারি ব্যক্তি বা পক্ষগুলিকেও প্রাসঙ্গিক ভিডিও ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করে আদালতে জমা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভের সময় কী ঘটেছিল, পুলিশ কী পদক্ষেপ করেছিল এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ কেমন ছিল, তা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশ ভবিষ্যতে অভিযোগগুলির বিচার ও তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছে সুপ্রিম কোর্ট।
আদালত আরও জানতে চেয়েছে, প্রতিবাদের স্থান হিসেবে যন্তর মন্তরকে ডিনোটিফাই করার সিদ্ধান্ত কি সুপ্রিম কোর্টের মৌখিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল, নাকি প্রতিবাদের স্থান হিসেবে ওই জায়গার উপযোগিতা নিয়ে আলাদা মূল্যায়ন করা হয়েছিল। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। আগে গঠিত একটি কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিয়েছিল।
পুলিশি পদক্ষেপ ও সাংবাদিকদের অভিযোগ
দিল্লির বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়েও একাধিক আবেদন শুনানির তালিকায় রয়েছে। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের সংগঠনগুলি অভিযোগ করেছে, বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করার সময় সাংবাদিকদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং কোথাও কোথাও মারধর বা হেনস্থার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফ্রি স্পিচ কালেক্টিভ, নেটওয়ার্ক অফ উইমেন ইন মিডিয়া, ইন্ডিয়া এবং দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টস-সহ বিভিন্ন সংগঠন সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুরক্ষা চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। সাংবাদিক আমান রাস্তোগিও আদালতের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে আবেদন করেছেন।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেটস-অন-রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন এবং লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর কনস্টিটিউশন বিক্ষোভের সময় আইনজীবীদের আটক ও হেনস্থার অভিযোগ তুলেছে। তাঁদের আবেদনে আটক আইনজীবীদের বিবরণ, সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের তথ্য, প্রাসঙ্গিক নথি সংরক্ষণ এবং আইনজীবীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুরক্ষা চাওয়া হয়।
এই অভিযোগগুলির পাশাপাশি দিল্লি পুলিশের বক্তব্যও আদালতে এসেছে। পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমার সুপ্রিম কোর্টে নিঃশর্ত ও নিঃসংশয় ক্ষমা চেয়েছেন বলে তাঁর হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আদালতের নির্দেশ ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বিক্ষোভের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।
BNSS-এর ১৭২ ধারা নিয়েও শুনানি
এই শুনানিতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা বা BNSS-এর ১৭২ ধারার সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা আবেদনেও নোটিস জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। এই ধারায় পুলিশকর্মীদের দেওয়া আইনসম্মত নির্দেশ মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেফতার করার ক্ষমতাও পুলিশকে দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বৃহস্পতিবারের শুনানিতে তিনটি পৃথক বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আদালতের সামনে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, SIR-এ ভোটার তালিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ এবং দিল্লির বিক্ষোভে পুলিশি পদক্ষেপের বৈধতা ও সাংবাদিক-আইনজীবীদের সুরক্ষা। রাহুল গান্ধীকে তাঁর ১২ অক্টোবরের আচরণের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে, SIR নিয়ে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের জবাব চাওয়া হয়েছে এবং বিক্ষোভ সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।