ইউজিসি নিয়ম নিয়ে কী বলল কেন্দ্র।কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতিগত বৈষম্য বন্ধ করতে চলতি বছর নতুন নিয়ম চালু করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)। কিন্তু সেই নিয়ম ঘিরে এমনই বিতর্ক তৈরি হয় যে শেষপর্যন্ত মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। গত ২৯ জানুয়ারি ওই নিয়মগুলির উপর স্থগিতাদেশ দেয় শীর্ষ আদালত। এবার সেগুলি নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানিতে কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে, নিয়মগুলি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের কথা ভাবছে সরকার। এমন নিয়ম তৈরি করা দরকার, যাতে কোনও শ্রেণির পড়ুয়াই বৈষম্য বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার বলে মনে না করেন। কিন্তু যে নিয়মের উদ্দেশ্য ছিল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতিগত বৈষম্য বন্ধ করা, তা নিয়ে বিরোধিতা শুরু হল কেন? সাধারণ শ্রেণির পড়ুয়াদের আপত্তি কোথায়? আবার তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি জনজাতি (ST) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (OBC) একাংশও কেন এই নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল? গোটা বিতর্কটি বুঝে নেওয়া যাক। পাশাপাশি, এই নিয়মগুলির উপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার সময় সুপ্রিম কোর্ট কী কী প্রশ্ন তুলেছিল এবং এখন কেন্দ্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী, তাও জেনে নেওয়া যাক।
কী ছিল ইউজিসির নতুন নিয়মে?
প্রথমেই জানা প্রয়োজন, গোটা বিতর্কের সূত্রপাত ইউজিসির ২০২৬ সালের নতুন নিয়মকে কেন্দ্র করে। ১৩ জানুয়ারি এই নিয়মগুলি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রকাশ করেছিল ইউজিসি। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ শোনা এবং তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। দেশের সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে সমতা কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়। পাশাপাশি সমান সুযোগ কেন্দ্র তৈরির কথাও বলা হয়েছিল। এই কমিটি ও কেন্দ্রের মূল কাজ ছিল বৈষম্যের অভিযোগ শোনা এবং বঞ্চিত শ্রেণির পড়ুয়াদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। সমতা কমিটিতে এসসি, এসটি এবং ওবিসি শ্রেণির প্রতিনিধিদের রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। নতুন নিয়মে এসসি, এসটির পাশাপাশি ওবিসি শ্রেণির পড়ুয়াদেরও জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর অধিকার দেওয়া হয়। আগে এই অধিকার ছিল শুধু এসসি এবং এসটি শ্রেণির পড়ুয়াদের। নতুন নিয়মে ওবিসি পড়ুয়াদেরও আনা হয়।
জেনারেলদের আপত্তি কোথায়?
জাতিগত বৈষম্যের সংজ্ঞা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিল সাধারণ শ্রেণির পড়ুয়াদের একাংশ। তাদের বক্তব্য ছিল, সাধারণ শ্রেণির কোনও পড়ুয়ার সঙ্গেও যদি জাতের ভিত্তিতে বৈষম্য করা হয়, তা হলে অভিযোগ জানানোর এবং সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার তাঁরা কেন পাবেন না? শুধু তাই নয় নতুন নিয়মে মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পুরনো বিধানটিও বাদ দেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি নিয়েও আপত্তি ওঠে।
এসসি, এসটি এবং ওবিসির আপত্তি কোথায়?
এই নিয়মের বিরোধিতা শুধু সাধারণ শ্রেণির পড়ুয়াদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এসসি এবং ওবিসির একাংশও নিয়মগুলি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, নিয়মের কয়েকটি বিষয় যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। সেগুলিকে আরও সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন।
নতুন নিয়মের কয়েকটি বিধান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। শেষপর্যন্ত তা পৌঁছয় সুপ্রিম কোর্টে। ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ইউজিসির ওই নতুন নিয়মগুলির উপর স্থগিতাদেশ দেয় আদালত। জানিয়েছিল, নতুন নিয়মের কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট নয়। সেগুলির অপব্যবহারের আশঙ্কাও রয়েছে।
শুনানিতে কী বলল কেন্দ্র?
৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার মামলার শুনানি হয় সুপ্রিম কোর্টে। শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মালা বাগচীর বেঞ্চকে জানান, পড়ুয়াদের উদ্বেগ দূর করতে চায় কেন্দ্র। এমন নিয়ম তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে কোনও শ্রেণির পড়ুয়াই মনে না করেন যে তাঁর সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে। এরপর সুপ্রিম কোর্টও ইউজিসির নতুন নিয়মগুলি নিয়ে পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেয়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন,'আগামী প্রজন্মের প্রতিটি পড়ুয়ার স্বার্থ রক্ষা করা জরুরি। এমন নিয়ম তৈরি করতে হবে, যাতে কোনও পড়ুয়ার মধ্যেই ভয় বা অসন্তোষের মনোভাব তৈরি না হয়'।
এখন কী হবে?
আপাতত ইউজিসির ২০২৬ সালের নতুন নিয়মগুলির উপর স্থগিতাদেশ বহাল। সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইউজিসির ২০১২ সালের পুরনো নিয়মগুলিই কার্যকর থাকবে। পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কেন্দ্রকে সময় দিয়েছে আদালত। ৪ সপ্তাহ পর মামলার পরবর্তী শুনানি। নতুন নিয়মগুলি খতিয়ে দেখার জন্য একটি কমিটি গঠনের কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার।
বিজেপির উভয় সঙ্কট
ইউজিসির নতুন নিয়ম এখন বিজেপির কাছে কার্যত শ্যাম রাখি না কূল। দল যদি নতুন নিয়মগুলি প্রত্যাহার করে, তা হলে ওবিসির একাংশের ক্ষোভের মুখে পড়তে হতে পারে। আবার নিয়মগুলি নিয়ে অবস্থান না বদলালে বিজেপির মূল ভোটব্যাঙ্ক উচ্চবর্ণের ভোটারদের অসন্তোষও সামলাতে হবে। সবমিলিয়ে উত্তরপ্রদেশের ভোটের আগে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে বিজেপি।