নেহা বোরার পুরো কাহিনিকখনও পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালাচ্ছেন। কখনও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বিজেপিকে নিশানা করছেন। কখনও আবার পুলিশ আটকের পরও স্লোগান দিচ্ছেন। আবার কখনও ব্যারিকেডে উঠে মুঠো পাকিয়ে স্লোগান। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে পা মিলিয়ে মিছিলেও হাঁটলেন। একটা সময়ে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধীকে তাঁর কাঁধে হাত রেখে হাঁটতেও দেখা গেল। এমন টুকরো টুকরো দৃশ্য গত কয়েক মাস ধরে দেখছে গোটা দেশ। এই তরুণীই এখন প্রতিবাদের মুখ। তিনি হলেন নেহা বোরা। কত দূর পড়াশুনো করেছেন নেহা? কীভাবে পৌঁছে গেলেন জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে?
চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (AISA) সভানেত্রী নেহা। শিক্ষার অধিকার, ছাত্রছাত্রীদের দাবি এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় এই ছাত্র সংগঠন। তবে নেহার কাহিনি শুধু ছাত্র রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নাট্যচর্চা, বইপড়া, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং পরিবারের সঙ্গে মতবিরোধের এক দীর্ঘ অধ্যায়।
উত্তরাখণ্ডের খতিমা থেকে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়
২৯ বছর বয়সি নেহা উত্তরাখণ্ডের খতিমার বাসিন্দা। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তাই ছোটবেলা কেটেছে বিভিন্ন শহরে। পশ্চিমবঙ্গেই দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির পড়াশোনা। সেই সময় থেকেই চারু মজুমদার, পাবলো নেরুদা এবং অরুন্ধতী রায়ের মতো লেখক ও চিন্তাবিদদের লেখা পড়তে শুরু করেন। পরবর্তীকালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ডক্টর বিআর অম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন।
নাটকে আগ্রহ
পড়াশোনার পাশাপাশি নাটকের প্রতি আগ্রহ নেহার। যোগ দেন সঙ্গওয়ারি নাট্যদলে। তাঁর মতে, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সব ধরনের জ্ঞান পাওয়া সম্ভব হয় না। তখন মানুষ অন্য জায়গায় সেই জ্ঞানের সন্ধান করে। এক সাক্ষাৎকারে নেহা জানিয়েছিলেন, নাটকের মাধ্যমে সৃজনশীল মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং নানা বিষয়ে শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই সময়েই ছাত্র রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বাড়ে তাঁর। যোগ দেন আইসাতে। ১৯৯০ সালে গঠিত এই ছাত্র সংগঠনটি সিপিআই (এমএল) এর।
বইয়ের পাতা থেকে আন্দোলনে
নেহার রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে এনটিসএ আন্দোলনের সময়। তখন তিনি দেখেন, যে সব বিষয় নিয়ে এত দিন বই, সিনেমা ও তথ্যচিত্রে পড়েছেন বা দেখেছেন, সেই বিষয়গুলিই সামনে রেখে ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছেন। বক্তৃতা দিচ্ছেন, প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, নিজেদের দাবি সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নেহার উপলব্ধি হয়, রাজনৈতিক ভাবনা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তাকে বাস্তবের মাটিতেও প্রয়োগ করা সম্ভব।
জেএনইউতে ভর্তি
২০২১ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (JNU) ভর্তি হন নেহা। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিক্সে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ নিয়ে পিএইচডি শুরু করেন। সেই সঙ্গে ছাত্র রাজনীতি ও বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তাঁর সক্রিয়তা বাড়তে থাকে।
তিহাড় জেলে
তবে ছাত্র রাজনীতির পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জেএনইউয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পর পুলিশ নেহাকে আটক করে। পরে তাঁকে তিহাড় জেলে পাঠানো হয়। ১ মার্চ মুক্তি পান তিনি।
বাবার সঙ্গে মতবিরোধ
ছাত্র রাজনীতির বাইরেও ব্যক্তিগত জীবনে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে নেহাকে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বাবা অবসর নিয়েছেন। নেহার দাবি, বামপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে তাঁর বাবা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। দুজনের মধ্যে প্রায় ১০ বছর ধরে কথাবার্তা বন্ধ। মানে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে পরিবারের মধ্যেও মতপার্থক্যের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে।
যন্তর মন্তরে অনশন
প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনশন করেছিলেন নেহাও। যে আন্দোলনে অনশন করেছিলেন সোনম ওয়াংচুকও। সেই সময়ে সংবাদমাধ্যমের নজর মূলত ওয়াংচুক ও সিজেপির দিকে থাকলেও নিজের দাবিতে অনড় ছিলেন নেহাও। বিভিন্ন শহরে একের পর এক আন্দোলনে যোগ দিতে দেখা যায় নেহাকে।