শুধুই মাইনে ফ্যাক্টর নয়, ঠিক কেন ISRO ছাড়লেন শতাধিক বিজ্ঞানী?

শতাধিক বিজ্ঞানী হয় ISRO ছাড়ছেন, না হয় স্বেচ্ছাবসর নিচ্ছেন। কেন এমনটা ঘটছে? কেবলমাত্র উচ্চ বেতনই কি একমাত্র কারণ এর নেপথ্যে? জেনে নিন বিস্তারিত...

Advertisement
শুধুই মাইনে ফ্যাক্টর নয়, ঠিক কেন ISRO ছাড়লেন শতাধিক বিজ্ঞানী?ইসরোতে কেন এই সঙ্কট
হাইলাইটস
  • শতাধিক বিজ্ঞানী হয় ISRO ছাড়ছেন, না হয় স্বেচ্ছাবসর নিচ্ছেন
  • ISRO-তে কেন এমনটা হচ্ছে?
  • উচ্চ বেতন ছাড়া আর কী কী কারণ?

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) বর্তমানে একটি অপ্রত্যাশিত সঙ্কটের মুখে পড়েছে। রকেট উৎক্ষেপণে ব্যর্থতা বা প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে নয়, বরং সংস্থার অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের একের পর এক পদত্যাগ ও স্বেচ্ছাবসরই এখন উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। গত কয়েক মাসে শতাধিক বিজ্ঞানী ইসরো থেকে ইস্তফা দিয়েছেন বা স্বেচ্ছাবসর নিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করেছে মহাকাশ দফতর। গগনযানের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কর্মরত বিজ্ঞানীদের পদত্যাগ ও স্বেচ্ছাবসরের উপর নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ প্রকল্পগুলির জন্য দক্ষ জনবল ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কেন ইসরো ছাড়ছেন বিজ্ঞানীরা?
বিশেষজ্ঞ এবং ইসরোর বর্তমান ও প্রাক্তন আধিকারিকদের মতে, একাধিক কারণ এই প্রবণতার জন্য দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ, সংস্থার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির অনিশ্চয়তা।

সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলির দ্রুত উত্থান। ২০২০ সালে ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্র বেসরকারি সংস্থার জন্য খুলে দেওয়ার পর থেকেই Skyroot Aerospace, Agnikul Cosmos, Pixxel, Bellatrix Aerospace, Dhruva Space, Digantara-সহ একাধিক স্টার্টআপ রকেট, উপগ্রহ, প্রপালশন সিস্টেম এবং মহাকাশভিত্তিক পরিষেবা তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।

ইসরোর বিজ্ঞানীদের কাছে এই সংস্থাগুলির আকর্ষণও কম নয়। তুলনামূলকভাবে বেশি বেতন, স্টক অপশন, কাজের ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ মিলছে সেখানে। পাশাপাশি, সরকারি সংস্থার তুলনায় অনেক কম সময়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগও রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রেও বেসরকারি সংস্থাগুলি বিজ্ঞানীদের আরও বড় ভূমিকা দিচ্ছে।

এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করছে ইসরোর প্রাক্তন বিজ্ঞানীরাই। গত কয়েক বছরে বহু অবসরপ্রাপ্ত বা প্রাক্তন শীর্ষ আধিকারিক নিজস্ব মহাকাশ স্টার্টআপ গড়েছেন বা নতুন সংস্থাগুলির পরামর্শদাতা হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। ফলে ইসরোর বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন কর্মসংস্থানের দরজা খুলে গিয়েছে।

Advertisement

শুধু বেসরকারি সংস্থা নয়, রয়েছে অভ্যন্তরীণ সমস্যাও
তবে শুধুমাত্র উচ্চ বেতন বা উন্নত সুযোগ-সুবিধাই পদত্যাগের একমাত্র কারণ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরোর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে।

গগনযানের G1 টেস্ট ফ্লাইট, SSLV-L1, GSLV-F17 এবং শিল্পক্ষেত্রে নির্মিত PSLV-N1-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনের সময়সূচি পিছিয়ে গিয়েছে। চলতি বছরে পরপর দুটি PSLV-র সমস্যার কারণে উৎক্ষেপণ কর্মসূচিও বিলম্বিত হয়েছে। এখনও পর্যন্ত ওই ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেনি ইসরো।

সংস্থার একাংশের বর্তমান ও প্রাক্তন আধিকারিকদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ক্রমশ চেয়ারম্যানের দফতরে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। এর ফলে অনুমোদন পেতে দেরি হচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রকল্পে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হচ্ছে।

বদলাতে হবে নিয়োগের ধরন
ইসরোর কয়েকজন শীর্ষ আধিকারিকের মতে, সংস্থার কর্মসংস্থানের মডেলেও পরিবর্তন আনা জরুরি। তাঁদের দাবি, নাসা (NASA) এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-র মতো প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি গ্রহণ করলে ইসরোরও সুবিধা হতে পারে।

নাসায় স্থায়ী কর্মী, চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ, এই তিন ধরনের কর্মী কাঠামো রয়েছে। এতে যেমন গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা সংরক্ষণ করা যায়, তেমনই নতুন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ করা সম্ভব হয়। অনেক মহাকাশ নীতি বিশেষজ্ঞের মতে, ইসরোও এই ধরনের হাইব্রিড মডেল গ্রহণ করলে দক্ষ বিজ্ঞানীদের ধরে রাখা সহজ হবে।

ইসরোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্প যত দ্রুত এগোচ্ছে, ততই ইসরো ভবিষ্যতে মানব মহাকাশ অভিযান, গভীর মহাকাশ গবেষণা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট এবং নিউক্লিয়ার প্রপালশনের মতো উন্নত গবেষণায় আরও বেশি গুরুত্ব দিতে পারবে।

তবে একসময় দেশের মহাকাশবিজ্ঞানীদের একমাত্র গন্তব্য ছিল ইসরো। এখন সেই চিত্র বদলেছে। বেসরকারি সংস্থাগুলি প্রতিযোগিতামূলক বেতন, দ্রুত কেরিয়ার উন্নতি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তৈরির সুযোগ দিচ্ছে। ফলে ইসরোর সামনে এখন শুধু দেশের সেরা মেধাকে আকর্ষণ করাই নয়, তাঁদের দীর্ঘদিন ধরে সংস্থায় ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

TAGS:
POST A COMMENT
Advertisement