কেতন সিয়া ও সোনম ও রাজা।-ফাইল ছবিপুনের লোহগড় দুর্গে কেতন আগরওয়ালের রহস্যমৃত্যুর তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রশ্ন। ঘটনাস্থলে কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই, নেই এমন কোনও সিসিটিভি ফুটেজ যেখানে হত্যার মুহূর্ত ধরা পড়েছে। ফলে তদন্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন একটাই, আদালতে কীভাবে প্রমাণ করা হবে যে এটি দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত খুন?
১৮ জুন সকালে ঠিক কী ঘটেছিল? কেতন কি নিজে থেকেই খাদে পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তদন্তকারীদের দাবি, কেতনকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু সেই দাবির পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
বর্তমানে পুনে পুলিশের ভরসা মূলত পারিপার্শ্বিক প্রমাণ। তদন্তে রয়েছে সিয়া ও চেতনের কল ডিটেল রেকর্ড, মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ, মুছে ফেলা মেসেজ, লোকেশন ডেটা, সিসিটিভিতে ধরা পড়া হুডি-পরা এক ব্যক্তির উপস্থিতি, ঘটনাস্থলের পুনর্নির্মাণ এবং দুই পরিবারের সদস্য-সহ একাধিক ব্যক্তির জবানবন্দি। কিন্তু এই সমস্ত তথ্যকে একসঙ্গে জুড়ে এমন একটি নির্ভুল প্রমাণের শৃঙ্খল তৈরি করতে হবে, যাতে অন্য কোনও সম্ভাবনার সুযোগ না থাকে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ঘটনার কোনও প্রত্যক্ষদর্শী এখনও সামনে আসেননি। যে জায়গায় কেতন পড়ে যান, সেখানে কোনও ক্যামেরাও ছিল না। ফলে আদালতে পুলিশকে সম্পূর্ণভাবে পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপরই নির্ভর করতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র সিয়া ও চেতনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রমাণ করলেই খুনের অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তদন্তকারীদের দেখাতে হবে, এই সম্পর্কই হত্যার উদ্দেশ্য তৈরি করেছিল এবং সেই উদ্দেশ্য থেকেই পরিকল্পিতভাবে কেতনকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, মোটিভ, পরিকল্পনা, ঘটনাস্থলে উপস্থিতি এবং ঘটনার পর অভিযুক্তদের আচরণ, সবকিছুই একটি অভিন্ন গল্পের অংশ হতে হবে।
১৮ জুন সকালে সিয়া কেতনের সঙ্গে ছিলেন, এটি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কিন্তু শুধু এই কারণেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব নয়। প্রতিরক্ষা সহজেই দাবি করতে পারে, এটি একটি দুর্ঘটনা ছিল। এমনকি সিয়ার পরিবার ইতিমধ্যেই দাবি করেছে, সে নিজে ট্রেকিংয়ে যেতে আগ্রহী ছিল না। এবং কেতনের অনুরোধেই লোহগড়ে গিয়েছিল। আদালতে যদি এই দাবি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
ঘটনাস্থলের পুনর্নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ডামি ট্রায়াল নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে পারে না যে একজন মানুষ ধাক্কা খেয়ে পড়েছিলেন, নাকি পা পিছলে খাদে পড়ে গিয়েছিলেন। একই জায়গা থেকে একাধিকবার পরীক্ষায়ও ভিন্ন ভিন্ন ফল আসতে পারে। ফলে এই পুনর্নির্মাণ তদন্তে সহায়ক হলেও, সেটি এককভাবে দোষ প্রমাণের ভিত্তি হতে পারে না।
চেতনের উপস্থিতি নিয়েও একই ধরনের আইনি জটিলতা রয়েছে। তদন্তে যদি প্রমাণিতও হয় যে সে লোহগড় দুর্গে ছিল, তবুও শুধু উপস্থিতি দিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র প্রমাণ করা যায় না। কেতনের পরিবারও জানিয়েছে, চেতন সিয়ার পাশাপাশি সিয়ার ভাইয়েরও পরিচিত ছিল। ফলে ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতির বিকল্প ব্যাখ্যাও আদালতে তুলে ধরা হতে পারে।
এই কারণেই তদন্তকারীরা সিয়ার পলিগ্রাফ বা লাই ডিটেক্টর পরীক্ষার কথা ভাবছেন। যদিও এই পরীক্ষার ফল আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, তবুও নতুন সূত্র বা তথ্য পাওয়া গেলে তার ভিত্তিতে স্বাধীন প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই পরীক্ষার জন্য আদালতের অনুমতির পাশাপাশি অভিযুক্তের সম্মতিও প্রয়োজন।
তদন্তের বাইরে আরও একটি তথ্য সামনে এসেছে। জানা গেছে, সিয়া ও কেতনের বিয়ের পাশাপাশি দুই পরিবারের মধ্যে সিয়ার ভাই এবং কেতনের বোনের বিয়ে নিয়েও আলোচনা চলছিল। যদিও তদন্তকারী সংস্থা এখনও নিশ্চিত করেনি, এই বিষয়টির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনও সরাসরি যোগ রয়েছে কি না।
এদিকে, কেতন হত্যা মামলার পর থেকেই লোহগড় দুর্গে দর্শনার্থীর ভিড় বেড়েছে। কৌতূহলী মানুষ সেই খাদটি দেখতে ভিড় করছেন, যেখানে কেতন পড়েছিলেন। স্থানীয়দের একাংশ ইতিমধ্যেই জায়গাটিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘সিয়া পয়েন্ট’ নামে ডাকতে শুরু করেছেন।
চার্জশিট দাখিলের জন্য পুলিশের হাতে এখনও সময় রয়েছে। তবে এই মামলায় শেষ পর্যন্ত আদালতে কী প্রমাণ দাঁড় করানো যায়, সেটাই নির্ধারণ করবে এটি একটি সফল তদন্ত হবে, নাকি ভারতের আরেকটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত রহস্য হয়ে থাকবে।