আসিরগড় দুর্গের রহস্য জানলে চমকে যাবেনমহাভারতের যোদ্ধা অশ্বত্থামা কি ৫,০০০ বছর পরেও পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? এই প্রশ্নটি আজও মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। বিশ্বাস করা হয়, ভগবান কৃষ্ণ অশ্বত্থামাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, সে যুগ যুগ ধরে একাকী ঘুরে বেড়াবে, প্রচুর রক্তক্ষরণ হবে, মৃত্যুর জন্য কামনা করবে কিন্তু কখনও মোক্ষ লাভ করবে না।
এদিকে, মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুর জেলার আসিরগড় দুর্গকে ঘিরে একটি রহস্যময় কিংবদন্তি চালু আছে। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, অশ্বত্থামা এখনও এই দুর্গে আসেন। দুর্গের ভিতরে একটি প্রাচীন শিব মন্দির রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন সকালে তালা খোলার আগে শিবলিঙ্গের উপর তাজা ফুল দেখা যায়। কে এই ফুল অর্পণ করেন তা আজও একটি রহস্য।
এছাড়াও, বেশ কিছু গ্রামবাসী দাবি করেন যে তারা কপালে গভীর ক্ষতসহ একজন অস্বাভাবিক লম্বা মানুষকে দেখেছেন। বলা হয়, লোকটি প্রায়শই ক্ষতস্থানে তেল বা হলুদ লাগানোর জন্য অনুরোধ করে। লোকেরা বিশ্বাস করেন ইনিই অশ্বত্থামা। যিনি এখনও তাঁর কর্মের ফল ভোগ করছেন এবং মুক্তির অপেক্ষায় আছেন। এক অভিশাপ যা তাঁকে অমর করেছে, কিন্তু তাঁর জীবনকে অন্তহীন যন্ত্রণায় পরিণত করেছে। কিন্তু ভগবান কৃষ্ণ কেন অশ্বত্থামাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন? চলুন এর পেছনের রহস্যটি জেনে নেওয়া যাক।
অশ্বত্থামা কে?
মহাভারতের কাহিনীতে অশ্বত্থামা নামটি রহস্য ও শক্তি উভয়েরই প্রতীক। তিনি ছিলেন মহগুরু দ্রোণাচার্য এবং তাঁর স্ত্রী কৃপীর পুত্র। কথিত আছে, সন্তান লাভের জন্য দ্রোণাচার্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন এবং এতে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান শিব তাঁকে এক মেধাবী ও শক্তিশালী পুত্রসন্তান দান করেন। এই পুত্রই পরবর্তীকালে অশ্বত্থামা নামে পরিচিত হন।
অশ্বত্থামা শৈশব থেকেই যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি তাঁর পিতা দ্রোণাচার্যের কাছ থেকে ধনুর্বিদ্যা এবং দিব্য অস্ত্রবিদ্যা শিখেছিলেন। তাঁকে মহাভারতের অন্যতম শক্তিশালী যোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়। দ্রোণাচার্য মহাভারতের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। ভীষ্ম পিতামহ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে, তিনি কৌরব সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর রণকৌশল ও শক্তির কারণে পাণ্ডবদের পক্ষে জয়লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তখন ভগবান কৃষ্ণ একটি পরিকল্পনা করেন। যুদ্ধের সময় খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয় "অশ্বত্থামা নিহত হয়েছেন।"
কিন্তু আদতে ভীম অশ্বত্থামা নামের একটি হাতিকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু "অশ্বত্থামা নিহত হয়েছেন" শুনে দ্রোণাচার্য শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন এবং অস্ত্র ত্যাগ করেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ধৃষ্টদ্যুম্ন সুযোগটি কাজে লাগিয়ে তাঁকে হত্যা করেন।
পিতার মৃত্যুর সত্য জানতে পেরে অশ্বত্থামা ক্রুদ্ধ হয়ে পাণ্ডবদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হলেন। যুদ্ধের সময় তিনি নারায়ণস্ত্র সহ শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। এই অস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব ছিল, কিন্তু ভগবান কৃষ্ণের পরামর্শে পাণ্ডবরা অস্ত্র ত্যাগ করে নিজেদের রক্ষা করেন।
মহাভারত যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও অশ্বত্থামার ক্রোধ কমেনি। এক রাতে তিনি পাণ্ডব শিবিরে আক্রমণ করেন। তিনি ধৃষ্টদ্যুম্নকে হত্যা করেন এবং অন্ধকারে দ্রৌপদীর পুত্রদের পাণ্ডব ভেবে ভুল করে তাদেরও হত্যা করেন। অধিকন্তু, অর্জুনের বংশধারা শেষ করার উদ্দেশ্যে তিনি উত্তরার গর্ভ ধ্বংস করার চেষ্টা করেন।
এইসব ঘটনায় ক্রুদ্ধ হয়ে ভগবান কৃষ্ণ অশ্বত্থামাকে অভিশাপ দিয়ে বলেন, সে যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবে। তার শরীরের ক্ষত কখনও সারবে না, সে কষ্ট পাবে এবং মুক্তির জন্য আকুল হবে, কিন্তু তার মৃত্যুও হবে না। এই কারণেই অশ্বত্থামাকে মহাভারতের এমন একটি চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যিনি অমর হওয়া সত্ত্বেও যন্ত্রণাময় জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। এটি এমন একটি উদাহরণ যা প্রমাণ করে মানুষের কর্মের ফল অনিবার্যভাবে পাওয়া যায়।