জগন্নাথ দেবের রথযাত্রাভগবান জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা শুরু হচ্ছে ১৬ জুলাই থেকে। ওড়িশার পুরীতে বিশ্ব দরবারে সমৃদ্ধ জগন্নাথ রথযাত্রা দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে মানুষজন ভিড় করেন। জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার সঙ্গে জড়িত একাধিক অলৌকিক ও পৌরাণিক কাহিনী। ভগবান জগন্নাথ দেবের রথের রশি ছোঁয়ার সৌভাগ্য সকলের হয় না। ভারত তথা বিশ্বের একাধিক দেশ থেকে মানুষজন আসেন এই রথ দেখতে, জগন্নাথের রথের দড়ি ছুঁতে। সমুদ্রতীরে নির্মিত চমৎকার শ্রীমন্দির থেকে শুরু করে প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বড় দণ্ড (রথ মার্গ) পর্যন্ত, যেদিকেই তাকানো যায়, কেবল ভক্তদের ভিড়, শঙ্খের ধ্বনি, করতালির শব্দ এবং জয় জগন্নাথ ধ্বনিই শোনা যায়।
বিরাট তিন রথে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার শোভাযাত্রা
রথযাত্রার সময় গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে জগন্নাথ দেব, তাঁর বড় ভাই বলরাম ও আদরের বোন সুভদ্রা আলাদা আলাদা রথে সওয়ার হয়ে নগর ভ্রমণে বেরোন। এই তিনটে রথই খুব যত্ন সহকারে কাঠ দিয়ে শুদ্ধতা বজায় রেখে তৈরি করা হয়।
নন্দীঘোষ-ভগবান জগন্নাথের রথ, যা হলুদ ও লাল রঙের বস্ত্র দ্বারা সাজানো থাকে।
তালধ্বজ-বড় ভাই বলরামের রথ, যা লাল ও সবুজ রঙের।
দর্পদলন-বোন সুভদ্রার রথ, যা লাল ও কালো পোশাকে সজ্জিত।
গুন্ডিচা মন্দিরে কেন যান
জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রাকে রথে বসানোর পর বিশাল শোভাযাত্রা শুরু হয়। তিন ভাইবোন মূল মন্দির থেকে যাত্রা শুরু করে গুন্ডিচা মন্দিরের দিকে এগিয়ে যান। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, গুন্ডিচা মন্দিরটি ভগবান জগন্নাথের মাসির বাড়ি বলে মনে করা হয়। এই পবিত্র স্থানটি গুন্ডিচা তীর্থ বা জনকপুরী নামেও পরিচিত।
বাহুদা রথযাত্রা কী
মাসির বাড়িতে ৭ দিনের আনন্দময় অবস্থানের পর ভগবান তাঁর মূল ধামে ফিরে আসেন। এই প্রত্যাবর্তন যাত্রাকে বাহুদা রথযাত্রা বলা হয়। ওড়িয়া ভাষায় বাহুদা শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো প্রত্যাবর্তন। এই যাত্রাটি মূল রথযাত্রার মতোই জাঁকজমক ও ভক্তির সাথে উদযাপিত হয়। ত্রিদেবতা তাঁদের রথে ফিরে মূল শ্রীমন্দিরে প্রত্যাবর্তন করেন, এবং এর মাধ্যমে জগন্নাথ রথযাত্রার এই অলৌকিক ও বার্ষিক উৎসব শেষ হয়।
রথের প্রতীকি ঘোড়া
পুরীর রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়, এটি ওড়িশার পরিচয় ও প্রাচীন ঐতিহ্যের একটি অংশ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসছে। মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে: রথ যদি থাকেই, তবে সেগুলি হাতে টানা হয় কেন এবং ঘোড়া থাকে না কেন? প্রকৃতপক্ষে, ভক্তরা ভক্তি সহকারে প্রভুর রথ টানাকে শুভ বলে মনে করেন, তাই হাজার হাজার মানুষ দড়ির সাহায্যে রথটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একত্রিত হন। এই দৃশ্যটি বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে, এমন নয় যে রথগুলিতে ঘোড়া থাকে না। তিনটি রথেই ঘোড়া রাখা হয়, কিন্তু সেগুলি কেবল প্রতীকী। এই ঘোড়াগুলি বিশেষভাবে নকশা করা হয় এবং প্রতিটি রথের আলাদা নাম থাকে, যা এই ঐতিহ্যকে আরও বিশেষ করে তোলে।
জগন্নাথের রথের ঘোড়ার নাম
ভগবান জগন্নাথের রথের নাম নন্দীঘোষ। এটি চারটি সাদা ঘোড়া দ্বারা চালিত হয়। তাদের নামগুলি ভগবানের চারটি দিব্য গুণের (সত্যবাদিতা, অবিচলতা, নম্রতা এবং শক্তি) প্রতীক।
শঙ্খ – এই নামটি ভগবান পাঞ্চজন্যের শঙ্খ থেকে অনুপ্রাণিত। এই শঙ্খ সকল শুভ সূচনা এবং ইতিবাচকতার প্রতীক।
বলাহক-দ্রুত গতি এবং অসীম শক্তির প্রতীক।
শ্বেত– শুভ্রতার মতোই এই ঘোড়াটি কোমলতা ও শান্তির এক পরিপূর্ণ প্রতীক।
হরিদাশ্ব- এই ঘোড়া জীবনের সকল প্রকার দুঃখ-কষ্ট ও বাধা দূর করে বলে মনে করা হয়।
বলরামের রথ তালধ্বজের ঘোড়ার নাম
ভগবান বলভদ্রের রথকে তালধ্বজ বলা হয়। তাঁর রথটি চারটি কালো ঘোড়া দ্বারা চালিত হয়, যা আমাদের জীবনের বাস্তব দর্শন শিক্ষা দেয়। এরা হল তিব্রা, ঘোরা, দীর্ঘশর্মা এবং স্বর্ণনাভা।
সুভদ্রার রথের ঘোড়ার নাম
দেবী সুভদ্রার রথের (দেবদলন বা দর্পদলন) লাল রঙের চারটি ঘোড়া রয়েছে। ঘোড়াগুলোর নাম হলো রোচিকা, মোচিকা, জিতা এবং অপরাজিতা।