রথযাত্রা ২০২৬ওড়িশার পুরীতে জগ্গনাথ ধামে প্রতি বছর রথযাত্রা নিয়ে পূণ্যার্থীদের অধীর অপেক্ষা থাকে। হিন্দু ধর্মে বর্ণিত চার ধামের অন্যতম জগন্নাথ ধামের এই রথযাত্রা আস্থা, পরম্পরা ও ভক্তির অদ্ভুত যোগ বলে মনে করা হয়। এই বছরও রথযাত্রা নিয়ে ভক্তদের মধ্যে প্রবল উৎসাহ রয়েছে। এ বছর কবে রথযাত্রা পড়েছে আর এর মাহাত্ম্য কী আসুন জেনে নেওয়া যাক।
কবে রথযাত্রা?
এই বছর জগন্নাথ রথযাত্রা ১৬ জুলাই শুরু হবে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ২৪ জুলাই পর্যন্ত চলবে। এই সময়ে ভগবান জগন্নাথ, তাঁর ভাই বলরাম এবং বোন সুভদ্রাকে দর্শন করতে লক্ষ লক্ষ ভক্ত পুরীতে আসবেন।
রথযাত্রার ধর্মীয় তাৎপর্য
জগন্নাথ রথযাত্রার সময় ভগবান জগন্নাথ, বলরাম এবং দেবী সুভদ্রা জাঁকজমকপূর্ণ রথে চড়ে শ্রীমন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরে যান। ভক্তরা নিজেরাই রথের দড়ি টানেন। বিশ্বাস করা হয় যে রথ টানলে পুণ্যলাভ হয় এবং অনিচ্ছাকৃত পাপ মোচন হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে এই যাত্রায় অংশগ্রহণ করলে দেবতার প্রতি তাদের ভক্তি এবং আধ্যাত্মিক সংযোগ বৃদ্ধি পায়। রথযাত্রার আগের দিন, স্নান পূর্ণিমার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
স্নানযাত্রা
এই বছর ২৯ জুন রথযাত্রার আগে জগন্নাথদেবের নিভৃতবাসে যাওয়ার প্রথা ভক্তদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পুরাণ অনুযায়ী, স্নানযাত্রার দিনটি ভগবান জগন্নাথের আবির্ভাব তিথি বা জন্মোৎসব হিসেবে পালিত হয়। এই দিনে মহাসমারোহে দেবতাকে ১০৮ কলসের পবিত্র জলে স্নান করানো হয়। বিশ্বাস করা হয়, এত দীর্ঘ স্নানের পর মহাপ্রভুর জ্বর আসে এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই কারণেই তিনি নির্দিষ্ট কয়েকদিনের জন্য ‘অনবাসর’ বা নিভৃতবাসে চলে যান। এই সময় সাধারণ ভক্তরা তাঁর দর্শন পান না। ই নিভৃতবাসের মধ্যেই মহাপ্রভুর আরোগ্যলাভের প্রতীকী আচার সম্পন্ন হয়। এরপর সুস্থ হয়ে তিনি রথে আরোহণ করে দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে গুন্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই যাত্রাকেই ভক্তরা ‘সোজা রথ’ নামে চেনেন।হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথের দড়িতে টান দেওয়া বা রথের চাকায় স্পর্শ করা অত্যন্ত পুণ্যজনক। মনে করা হয়, এর মাধ্যমে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তির পথ সুগম হয়। তাই প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত রথযাত্রায় অংশ নিতে ভিড় জমান।
রথযাত্রা
তবে এই যাত্রায় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা একা থাকেন না। তিনটি পৃথক রথে তাঁদের সঙ্গে থাকেন বিশেষ দেব-দেবীরা। জগন্নাথদেবের রথে অবস্থান করেন মদনমোহন, বলরামের রথে থাকেন রামকৃষ্ণ এবং সুভদ্রার রথে থাকেন সুদর্শনা।সাত দিন গুন্ডিচা মন্দিরে অবস্থানের পর মহাপ্রভুর প্রত্যাবর্তনকে বলা হয় ‘উল্টোরথ’ বা ‘পুনর্যাত্রা’। অনেক পৌরাণিক কাহিনিতে এই যাত্রাকে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনে প্রত্যাবর্তনের স্মৃতির সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।বাংলার গ্রামাঞ্চলে রথযাত্রা মানেই মেলা, যাত্রাপালা, নাগরদোলা, জিলিপি, পাঁপড় ভাজা এবং মাটির খেলনার রঙিন আয়োজন। ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি এই উৎসব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলারও অন্যতম মাধ্যম।
দিনক্ষণ
স্নানযাত্রা: ২৯ জুন (১৪ জ্যৈষ্ঠ), সোমবার। (পূর্ণিমা তিথি শুরু হবে ২৮ জুন রাত ২টো ৪৬ মিনিটে, থাকবে ২৯ জুন ভোর ৪টে ৪৬ মিনিট পর্যন্ত)।
রথযাত্রা: ১৬ জুলাই (৩১ আষাঢ়), বৃহস্পতিবার। (দ্বিতীয়া তিথি থাকবে ১৫ জুলাই বেলা ১টা ৪৬ মিনিট থেকে ১৬ জুলাই সকাল ১১টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত)।
উল্টোরথ (পুনর্যাত্রা): ২৪ জুলাই (৭ শ্রাবণ), শুক্রবার।
সনাতন ধর্মের অন্যতম বৃহত্তম এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ওড়িশা, ঝাড়খণ্ডের পাশাপাশি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তেও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। পুরীর জগন্নাথ মন্দির, হুগলির মাহেশ, ইস্কনের বিভিন্ন মন্দির থেকে শুরু করে বহু বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান—সব জায়গাতেই এখন রথযাত্রার প্রস্তুতি তুঙ্গে। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে ভগবান জগন্নাথ, দাদা বলরাম এবং বোন সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে মাসির বাড়ি অর্থাৎ গুন্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই মহাযাত্রাই রথযাত্রা নামে পরিচিত। তবে এই উৎসবের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস।