প্রতি বছরে ৩ দিন লাল হয়ে যায় ব্রহ্মপুত্র নদের জল, কামাখ্যা মন্দিরের এই আকর্ষণীয় কাহিনি জেনে নিন

হিন্দুধর্মে অসমের কামাখ্যা মন্দিরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেবী কামাখ্যা শক্তিরই একটি রূপ। তিনি রূপ, সৃষ্টি, উর্বরতা ও ঋতু চক্রের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ বিষয় হল, এই মন্দিরে কোনও প্রতিমার পূজা করা হয় না বরং একটি যোনি-আকৃতির শিলাকে পূজা করা হয়।

Advertisement
প্রতি বছরে ৩ দিন লাল হয়ে যায় ব্রহ্মপুত্র নদের জল, কামাখ্যা মন্দিরের এই আকর্ষণীয় কাহিনি জেনে নিনপ্রতি বছরে ৩ দিন লাল হয়ে যায় ব্রহ্মপুত্র নদের জল
হাইলাইটস
  • হিন্দুধর্মে অসমের কামাখ্যা মন্দিরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
  • দেবী কামাখ্যা শক্তিরই একটি রূপ।
  • এই মন্দিরে কোনও প্রতিমার পূজা করা হয় না।

হিন্দুধর্মে অসমের কামাখ্যা মন্দিরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেবী কামাখ্যা শক্তিরই একটি রূপ। তিনি রূপ, সৃষ্টি, উর্বরতা  ও ঋতু চক্রের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ বিষয় হল, এই মন্দিরে কোনও  প্রতিমার পূজা করা হয় না বরং একটি যোনি-আকৃতির শিলাকে পূজা করা হয়, যা নারীশক্তির প্রতীক এবং জীবনের উৎস হিসেবে বিবেচিত। 

প্রতি বছর নীলাচল পাহাড়ের এই এলাকায় অম্বুবাচী মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম বৃহত্তম মেলা। বিশ্বাস করা হয় যে এই সময়ে দেবী কামাখ্যার বার্ষিক ঋতুকালীন অবস্থা হয়। এই তিন দিন মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে, যা বিশ্রাম ও শুদ্ধিকরণের সময় বলে মনে করা হয়। 

মেলা উপলক্ষে আষাঢ় মাসে হাজার হাজার ভক্তের আগমন ঘটে। এই সময় পরিবেশ ভক্তিভাবনায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বলা হয় এই সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর জল হালকা লাল হয়ে যায়, যা দেবীর ঋতুস্রাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ঐতিহ্যটি নারীত্বের প্রতি সম্মান এবং সৃষ্টির শক্তির প্রতীক।

কামাখ্যা মন্দির কেন বিশেষ?

কামাখ্যা মন্দিরের বিশেষত্ব শুধু এর পুজো পদ্ধতিতেই নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত প্রাচীন কিংবদন্তিতেও নিহিত হয়েছে। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, দেবী সতী শিবের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবা দক্ষরাজা কোনও ভাবেই এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি। তাই বিশাল একটি যজ্ঞের সময়ে  শিবকে আমন্ত্রণ জানানি দক্ষরাজা। এই অপমান সহ্য করতে না পেরে সতী যজ্ঞের আগুনে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।

যখন শিব এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন, তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন ও সতীর দেহ কাঁধে তুলে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করলেন। তাঁর এই উগ্র রূপ এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল, যে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংসের আশঙ্কায় পড়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে দিলেন। সতীর দেহের খণ্ডাংশগুলি যেখানেই পতিত হয়েছিল, সেখানেই শক্তিপীঠ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্বাস করা হয় যে মোট ৫১টি শক্তিপীঠ রয়েছে। এই স্থানগুলির মধ্যে একটি হল কামাখ্যা মন্দির, যেখানে সতীর গর্ভ (যোনি) পতিত হয়েছিল। এই কারণেই এই মন্দিরটিকে নারী শক্তি, সৃষ্টি এবং প্রকৃতির সবচেয়ে মৌলিক রূপের প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

Advertisement

কামাখ্যা মন্দির অন্যান্য মন্দির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কোনও প্রচলিত মূর্তি, কিংবা কোনও দেবীর মুখ বা প্রতিমা দেখতে পাবেন না। এই মন্দিরের পুজোর প্রধান কেন্দ্র হল যোনির আকৃতির একটি শিলা। যাকে নারীশক্তির প্রতীক এবং সৃষ্টির আদি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রথমে এটি কিছুটা অদ্ভুত বা আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। মন্দিরের ভেতরে এই শিলাটি একটি গুহার মতো জায়গায় অবস্থিত, যেখানে একটি প্রাকৃতিক ঝর্ণা এটিকে সারা বছর আর্দ্র রাখে। পুরোহিত ও পুরোহিতারা এটিকে বস্ত্র এবং ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখেন।

এখানে আসা অনেক মহিলাই বলেন, গুহায় প্রবেশ করার পর তাঁরা এক অনন্য শক্তি অনুভব করেন। এমন এক ক্ষমতা যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। এই মন্দিরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হল, এখানে ঋতুস্রাবকে গোপন বা হেয় করার পরিবর্তে পবিত্র বলে গণ্য করা হয়। যেখানে বেশিরভাগ জায়গায় এই বিষয়ে আলোচনা করাও নিন্দনীয়, সেখানে এখানে এটিকে দেবীর শক্তির প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। 

প্রতি বছর জুন বা জুলাই মাসে অম্বুবাচী মেলার সময় কামাখ্যা মন্দিরের দরজা তিন দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে এই সময়ে দেবী কামাখ্যার ঋতুস্রাব হয়। এই সময়ে পুরোহিতরা মন্দিরে প্রবেশ করেন না এবং সমস্ত আয়োজন নারী পরিচারিকারাই সামলান। এই সময়ে নিকটবর্তী ব্রহ্মপুত্র নদীর জল লাল হয়ে যায়, যা দেবীর ঋতুস্রাবের চিহ্ন বলে মনে করা হয়। লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই অসাধারণ ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে এবং আশীর্বাদ লাভ করতে আসেন।

তিন দিন পর, চতুর্থ দিনে মন্দিরের দরজা আবার খুলে দেওয়া হয়। দেবীকে বিশেষ স্নান ও পূজা দেওয়া হয়, যার পরে ভক্তদের বস্ত্র বা পবিত্র জল নিবেদন করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে এই নিবেদন সন্তান ধারণ ও স্বাস্থ্য সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। এটি বিশ্বাসের কারণে নাকি অন্য কোনো কারণে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে, কিন্তু দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা এই ঐতিহ্যকে আরও বিশেষ করে তোলে।

নদীর জল লাল হওয়া নিয়ে বিজ্ঞান কী বলে?

বিজ্ঞানীরা কামাখ্যা মন্দিরের এই ঘটনার জন্য একাধিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন যে মন্দিরের চারপাশের পাহাড়ে সিনাবার (একটি লাল খনিজ) পাওয়া যায়, যা বর্ষাকালে জলে মিশে গিয়ে জলকে লাল রঙ দেয়। অন্য গবেষকরা মনে করেন যে বর্ষাকালে জন্মানো এক বিশেষ ধরণের শৈবাল এর কারণ হতে পারে। কেউ কেউ এও বিশ্বাস করেন যে পূজার সময় সিঁদুর মাখানো হয়, তা থেকেও জল লাল হতে পারে।

তবে এরমধ্যে কোনটি আসল তথ্য তার কোনও  নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই ঘটনাটি প্রতি বছর অম্বুবাচী মেলার সময়েই ঘটে। ব্রহ্মপুত্র নদীর জল শুধুমাত্র সেই তিন দিনই লাল দেখায়, অন্য সময়ে নয়। তাই, কেউ কেউ একে অলৌকিক ঘটনা বলে মনে করেন, আবার অন্যরা একে কাকতালীয়ও বলেন।

 

POST A COMMENT
Advertisement