
শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোশোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো কলকাতায় আয়োজিত প্রথম পুজো। নবকৃষ্ণ দেবের সূচনা করা এই পুজোয় যোগ দিয়েছিলেন লর্ড ক্লাইভ থেকে লর্ড হেস্টিংসের মতো ব্রিটিশ শাসকেরা। এই রাজবাড়ির পুজো দেখে মুগ্ধ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিত্বরা। নবকৃষ্ণ দেবের দত্তক সন্তান গোপীমোহন ও নিজের সন্তান রাজকৃষ্ণ দেবের সম্পত্তি আলাদা হওয়ার পর থেকেই দুই বাড়িতে আলাদা আলাদা পুজো ও নিয়ম-নীতি পালন করা হয়। একদিকে গোপীমোহনের ছেলে রাধাকান্ত দেবের বাড়ির পুজোতে কাঠামো পুজো হয় রথের দিন। কিন্তু রাজকৃষ্ণ দেবের বাড়িতে উল্টো রথের দিন কাঠামো পুজোর নিয়ম রয়েছে। রাজকৃষ্ণ দেবের এই শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো এই বছর ২৩৭ বছরে পা দিল। এই রাজবাড়ির সদস্য শুভদীপ কৃষ্ণ দেব জানালেন উল্টোরথের দিন থেকেই পুজোর যাবতীয় আলোচনা-কথাবার্তা শুরু হয়।
উল্টোরথে কাঠামো পুজো
শুভদীপ কৃষ্ণ বলেন, 'দুর্গা প্রতিমার কাঠামো পুজো হয় উল্টোরথে। ওইদিন তিন সাড়ে তিন ফুটের একটা কচি বাঁশ, নবজাতক বাঁশকে পুজো করা হয় এবং যখন প্রতিমা নির্মাণ করা হয় তখন মায়ের ডান পায়ে সেটা থাকে। ওটা দিয়েই মায়ের ডান পা গঠন করা হয়। সেটাকেই আমরা কাঠামো পুজো বলি আর সেটাই এই রাজবাড়িতে পুজোর আরম্ভ।' শুভদীপ কৃষ্ণ জানান যে উল্টোরথের পর থেকেই পুজোর যাবতীয় কথাবার্তা সব শুরু হয়, প্রস্তুতি পর্ব হয় উল্টোরথের পর থেকেই। এর ঠিক ১৫দিন পর প্রতিমা তৈরি কাজ শুরু হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

রাজবাড়ির পুরনো প্রথা
শোভাবাজার রাজবাড়ির সদস্য বলেন, 'রাজবাড়ির নিয়ম অনুযায়ী এক মেটে (প্রথম মাটি ধরানো) ঠাকুর তৈরির পর তা দালানে ওঠে। সেখানেই ঠাকুরের যাবতীয় কাজ সারা হয়।' একই পরিবারের শিল্পীরা বংশপরম্পরায় এই রাজবাড়ির প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজকৃষ্ণ দেবের বংশের নিয়মানুযায়ী সারা বছরই এখানে গুপিনাথ ও রাধারানি পূজিত হন। কিন্তু পুজোর সময় সেই দালানে ওঠেন মা এবং সেখানে আগে যেহেতু পাঁঠা বলি হতো, এখন সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই একটা শুভ তিথি দেখে যেদিন মা দুর্গা দালানে ওঠেন, ওইদিনই গুপিনাথ ও রাধারানি বাড়ির দোতলার একটি ঘরে চলে যান। চতুর্থীর দিন মা বেদিতে ওঠেন বলে জানান শুভদীপ কৃষ্ণদেব।

২৩৭ বছরে পা দিল এই পুজো
প্রসঙ্গত, রাজকৃষ্ণদেবের বাড়ির প্রতিমার সিংহটি স্টিলরঙা ও মহিষাসুরের রং সবুজ। রাজকৃষ্ণ দেবের বাড়ির প্রতিমার সামনে সার দিয়ে বেশ কয়েকটা জরির সুতো ঝোলানো থাকে। মা ঘরের মেয়ে তাই চিকের আড়ালে থাকেন। বাইরের মানুষ যাতে মাকে সরাসরি বা না-দেখতে পায়, সেইজন্য এই ব্যবস্থা। এখানে দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না, আতপচাল, ফল, মিষ্টি দই, দেবীকে ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। একসময় বাড়িতে ভিয়েন বসত, তৈরি হত নানারকমের মিষ্টি। সেই রীতি আজও বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন রাজকৃষ্ণ দেবের বংশধররা।