পুরীর রথযাত্রা অহিন্দু কোনও ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারেন না পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে। ঢুকতে পারেননি ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধীও। অথচ রথযাত্রার দিন সেই মন্দিরের রথই দাঁড়ায় এক মাজারের সামনে। জানেন কেন?
পুরীর জগন্নাথ মন্দির থেকে ২০০ মিটার দূরে অবস্থিত শালবেগ মাজার। এর সঙ্গেই জড়িয়ে জগন্নাথদেবের সেই মুসলিম ভক্তের কাহিনী। মুঘল আমলে শালবেগ ছিলেন জগন্নাথদেবের পরম ভক্ত। মুঘল বাদশাহ জাহাঙ্গিরের আমলে বাংলার গভর্নর ছিলেন জাহাঙ্গির কুলি খান। তিনি এক হিন্দু ব্রাহ্মণ মহিলাকে বিয়ে করেন। যিনি ছিলেন নীলাচলের একনিষ্ঠ ভক্ত। তাঁদের সন্তান শালবেগ ধর্মে মুসলিম হলেও ছোটবেলা থেকেই মায়ের মুখে শুনে এসেছিলেন জগন্নাথদেবের লীলা কাহিনি। সেই সব গল্প শুনতে শুনতেই মনে মনে জগন্নাথদেবের পরম ভক্ত হয়ে পড়েন শালবেগ। কিন্তু পুরীর মন্দিরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই ইচ্ছা থাকলেও কখনও পুরীর মন্দির দর্শনে যেতে পারেননি।
একবার যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর আহত হন শালবেগ। অনেক বৈদ্য দেখিয়েও ক্ষত নিরাময় হচ্ছিল না তাঁর। ছেলের কষ্ট দেখে জগন্নাথের আরাধনা করার পরামর্শ দেন তাঁর মা। শালবেগ মায়ের কথা মেনে নিয়ে আরাধনা শুরু করেন তিনি। একদিন শালবেগ স্বপ্নে স্বয়ং জগন্নাথদেবকে দেখতে পান। তিনি দেখেন প্রভু তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
ঘুম ভাঙলে শালবেগ বুঝতে পারেন সবটাই স্বপ্ন ছিল, কিন্তু তাঁর ক্ষত সেরে যায়। আর দেরি না করে ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের দিকে রওনা দেন তিনি। কিন্তু নিয়মের কারণে মন্দিরের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
মৃত্যুর আগে শালবেগ পুরীর শালবেগ মন্দিরের কাছে একটি কুঁড়ে ঘর তৈরি করে সেখানেই জীবনের শেষ ক’টি দিন কাটিয়ে যান। শালবেগ বলেছিলেন, ‘আমার মনে যদি প্রকৃত ভক্তি থাকে,তা হলে ভগবান অবশ্যই আমার ডাকে সাড়া দেবেন।’ প্রচলিত বিশ্বাস, শেষ শয্যায় ভক্তের কান্না ঈশ্বরের হৃদয় স্পর্শ করে।
একবার রথযাত্রার দিন জগন্নাথ মন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরে যাওয়ার সময়ে রাস্তার পাশে শালবেগের সমাধিস্থলে ভগবান জগন্নাথের রথ নান্দীঘোষ নিজে থেকেই থেমে যায়। বহু চেষ্টা করেও কেউ রথ নাড়াতে পারে না। তখন এক ব্যক্তি শালবেগের ভক্তির ঘটনা সকলকে স্মরণ করান। শালবেগের নামে জয়জয়কার হতেই রথের চাকা ফের গড়াতে থাকে।
সেই থেকে আজও রথযাত্রার সময় এই সমাধির সামনে রথকে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড় করানো হয়।