ডিএ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের জন্য একদিকে সুখবর, অন্যদিকে অষ্টম বেতন কমিশন নিয়ে এখনও কাটেনি অনিশ্চয়তা। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় কর্মীদের মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ বেড়ে হয়েছে ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ, মূল বেতনের ৬৩ শতাংশ হারে ডিএ পাওয়ার কথা কর্মীদের। কিন্তু এই ডিএ বৃদ্ধি মানেই কি অষ্টম বেতন কমিশন চালু হয়ে গেল? ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকেই কি নতুন বেতন ও পেনশন কার্যকর হবে? ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কত হবে, ন্যূনতম বেসিক পে কত বাড়বে, আর বকেয়া টাকা বা এরিয়ার কবে মিলবে?
১. ৬৩ শতাংশ ডিএ, কবে থেকে কার্যকর?
কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের জন্য ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর ডিএ বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। ২৯ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রকের তরফে জারি করা নির্দেশিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ডিএ-র হার ৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬৩ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সপ্তম বেতন কমিশনের অধীনে বেতন পাওয়া কেন্দ্রীয় কর্মীরা এখন মূল বেতনের ৬৩ শতাংশ হারে মহার্ঘ ভাতা পাবেন। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় পেনশনভোগীদের ডিয়ারনেস রিলিফ বা ডিআর-ও ৩ শতাংশ বেড়েছে। এই সিদ্ধান্তে উপকৃত হবেন প্রায় ৪৮.৫৪ লক্ষ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী এবং ৬৮.৭১ লক্ষ পেনশনভোগী।
তবে এই ৬৩ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির সঙ্গে অষ্টম বেতন কমিশনের সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। এটি সপ্তম বেতন কমিশনের অধীনেই মহার্ঘ ভাতা সংশোধনের সিদ্ধান্ত। অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান বেতন কাঠামো অনুযায়ী ডিএ দেওয়া হবে। তাই ডিএ ৬৩ শতাংশ হওয়াকে নতুন বেতন কাঠামো চালু হওয়ার ইঙ্গিত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
২. ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কত হবে? নতুন বেসিক পে কত?
অষ্টম বেতন কমিশনে কর্মীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম হল ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর। এই ফ্যাক্টরের ভিত্তিতেই বর্তমান বেসিক পে সংশোধন করে নতুন বেসিক বেতন নির্ধারণ করা হবে। ফলে ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কত হবে, তার উপরই অনেকটা নির্ভর করবে কর্মীদের নতুন বেতনের অঙ্ক।
তবে এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার কোনও নির্দিষ্ট ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ঘোষণা করেনি। নতুন ন্যূনতম বেসিক পে কত হবে, তা-ও জানানো হয়নি। এর আগে সপ্তম বেতন কমিশনে ২.৫৭ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কার্যকর হয়েছিল। তার ফলে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের ন্যূনতম বেসিক বেতন ৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছিল ১৮ হাজার টাকা।
এ বার ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ১.৯২, ২.৫৭ কিংবা ৩ হতে পারে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। কিন্তু এই অঙ্কগুলির কোনওটিকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কমিশন সুপারিশ জমা দেওয়ার পর সরকার তা পর্যালোচনা করবে। তার পরেই ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর এবং নতুন বেসিক পে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
৩. পেনশন ও ফ্যামিলি পেনশন কত বাড়বে?
অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশের প্রভাব শুধু কর্মরত সরকারি কর্মীদের বেতনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পেনশন এবং ফ্যামিলি পেনশনের উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই কর্মীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীরাও কমিশনের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বর্তমানে পেনশনভোগীদের মূল প্রশ্ন, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে তাঁদের বেসিক পেনশন কতটা বাড়বে। একই সঙ্গে ফ্যামিলি পেনশনের অঙ্ক কীভাবে সংশোধন করা হবে, তা নিয়েও রয়েছে আগ্রহ। তবে এখনও পর্যন্ত নতুন পেনশন নির্ধারণের কোনও চূড়ান্ত ফর্মুলা বা নির্দিষ্ট অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি।
কমিশনকে বেতন ও পেনশন সংশোধনের সুপারিশ তৈরির সময় সরকারের আর্থিক পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য খরচের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে অ-অবদানভিত্তিক পেনশন প্রকল্পের কারণে সরকারের উপর কতটা আর্থিক চাপ পড়তে পারে, সেটিও বিবেচ্য বিষয়। ফলে পেনশন কত বাড়বে, তা জানতে কমিশনের রিপোর্ট এবং সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
৪. ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকেই কি চালু হবে অষ্টম বেতন কমিশন?
কর্মী ও পেনশনভোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে অষ্টম বেতন কমিশনের কার্যকর হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে। অনেকেরই প্রশ্ন, ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকেই কি নতুন বেতন ও পেনশন কার্যকর হবে?
এর পিছনে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবরের একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি। সেখানে আগের বেতন কমিশনগুলির সাধারণ ১০ বছরের চক্রের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, সেই ধারা অনুযায়ী অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশের প্রভাব সাধারণভাবে ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে প্রত্যাশিত। কিন্তু এই বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে, ওই তারিখ থেকে নতুন বেতন ও পেনশন কার্যকর করার চূড়ান্ত নির্দেশিকা সরকার ইতিমধ্যেই জারি করেছে।
অর্থাৎ, ১ জানুয়ারি ২০২৬ একটি সম্ভাব্য কার্যকর হওয়ার তারিখ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু নতুন বেতন কাঠামো কবে থেকে বাস্তবে কার্যকর হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। কমিশনের সুপারিশ জমা পড়া এবং সরকার তা অনুমোদন করার পরেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
৫. এরিয়ার কবে মিলবে?
যদি সরকার শেষ পর্যন্ত ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে কর্মী ও পেনশনভোগীদের ওই তারিখ থেকে প্রাপ্য বর্ধিত বেতন বা পেনশনের বকেয়া পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে এরিয়ার কত টাকা হবে, কোন সময়ের জন্য তা দেওয়া হবে এবং কবে থেকে টাকা পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা নেই।
এ ক্ষেত্রে সরকারের বিজ্ঞপ্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার তারিখ, বকেয়া হিসাবের পদ্ধতি এবং টাকা মেটানোর সময়সীমা সবই নির্ভর করবে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর। তাই এখনই নির্দিষ্ট অঙ্কের এরিয়ার পাওয়ার দাবি করা ঠিক হবে না।
৬. কবে জমা পড়বে অষ্টম বেতন কমিশনের রিপোর্ট?
কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কমিশনকে সুপারিশ জমা দেওয়ার জন্য গঠনের তারিখ থেকে ১৮ মাস সময় দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে ২০২৭ সালের মে মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা পড়ার কথা। কমিশন চাইলে কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে সুপারিশ চূড়ান্ত হলে তার আগে অন্তর্বর্তী রিপোর্টও জমা দিতে পারে।
রিপোর্টে নতুন বেসিক বেতন, ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর, পেনশন সংশোধন এবং অবসরকালীন অন্যান্য সুবিধা নিয়ে সুপারিশ থাকতে পারে। রিপোর্ট জমা পড়ার পর সরকার তা খতিয়ে দেখবে। সব সুপারিশ গ্রহণ করা হবে, নাকি কিছু পরিবর্তন করা হবে, সেই সিদ্ধান্তও নেবে কেন্দ্রীয় সরকার।
সব মিলিয়ে, কেন্দ্রীয় কর্মীদের জন্য ৬৩ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও অষ্টম বেতন কমিশন নিয়ে এখনও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর বাকি। ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে কি না, ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কত হবে এবং এরিয়ার কবে মিলবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। আপাতত কমিশনের রিপোর্ট ও কেন্দ্রের চূড়ান্ত ঘোষণার দিকেই নজর রাখতে হবে।