বাংলাদেশের গারমেন্টেসের উপর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক২০২৬-২৭ কেন্দ্রীয় বাজেটে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। যে যে সেক্টরের জন্য জরুরি ঘোষণা করা হয়েছে, সেই তালিকায় রয়েছে বস্ত্রশিল্পও। বাজেটে রেশম উৎপাদন, যন্ত্রপাতি সহায়তা, তাঁত ও হস্তশিল্প কর্মসূচি এবং বস্ত্র খাতে স্কিল বৃদ্ধির জন্য কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়েছে।
বাজেট ২০২৬-এ মূলত টেক্সটাইল খাতের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্বনির্ভরতা, কর্মসংস্থান এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার বাজারে নিজেদের অস্তিত্ব বৃদ্ধি করাই এইবারের বাজেটে লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্র।
বাংলাদেশের টেক্সটাইল বাজারের উপর সপাটে জবাব
বাজেটে বস্ত্র শিল্পের উপর জোর দেওয়াকে বাংলাদেশের উপর সার্জিক্যাল স্ট্রাইকই বলছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। আসলে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প সবসময়ই ভারতের দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছিল। কিন্তু যতদিন বাংলাদেশে ভারত-সমর্থিত সরকার ছিল, ততদিন ভারত প্রতিবেশীর কর্তব্য হিসেবে এই ক্ষতি সহ্য করেছে। তবে, বাংলাদেশ থেকে হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর, সেখানকার ইউনূস সরকার সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত ভাবেই ভারতের সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ককে তলানিতে নিয়ে গিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লি যে পাল্টা চাল দেবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!
নতুন নীতি অনুসারে, ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে দেশের টেক্সটাইল বাজারকে বাংলাদেশের তুলনায় আরও উন্নত করে তোলার কৌশল ঘোষণা করা হয়েছে। আর সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
২০২৬-২৭ বাজেটে টেক্সটাইল খাতের জন্য কী কী উদ্যোগ?
ভারতের বস্ত্র খাতকে আকর্ষণীয় ও গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী করে তুলতে এদিন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন বেশ কিছু ঘোষণা করেছেন।
এছাড়াও, খাদি, তাঁত এবং হস্তশিল্পকে শক্তিশালী করার জন্য বাজেটে মহাত্মা গান্ধী গ্রাম স্বরাজ উদ্যোগ শুরু করার ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে কানেকশন ও ব্র্যান্ডিং সহজতর হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, এই দুই উদ্যোগের ফলে প্রশিক্ষণ, স্কিল, প্রক্রিয়া এবং উৎপাদনের মানকে সুবিন্যস্ত করবে।
এছাড়াও, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন টেক্সটাইল শিল্পের জন্য আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছেন।
১. ন্যাশনাল ফাইবার প্ল্যান
রেশম, পশম এবং পাটের মতো প্রাকৃতিক তন্তু, কৃত্রিম তন্তুর জন্য ন্যাশনাল ফাইবার প্ল্যান করা হয়েছে।
২. টেক্সটাইল সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প
যন্ত্রপাতি, সাধারণ পরীক্ষা ও সার্টিফিকেশন কেন্দ্রের জন্য ক্লাস্টারগুলিকে আধুনিকীকরণের জন্য টেক্সটাইল সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্পে জোর দেওয়া হবে।
৩. SAMARTH 2.0-এর সূচনা করা হয়েছে
শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে টেক্সটাইল স্কিল বাস্তুতন্ত্রের আধুনিকীকরণ ও আপগ্রেড করার জন্য SAMARTH 2.o-এর সূচনা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল টেক্সটাইল শিল্পের আধুনিকীকরণ।
২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে
কেন্দ্রের তরফে ২০৩০ সালের মধ্যে বস্ত্র খাতকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার টার্গেট নিয়েছে কেন্দ্র। এর জন্য বাজার দখল করা এবং বাজারে থাকা প্রতিযোগীদের চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন।
ভারতের এই পদক্ষেপ কেন বাংলাদেশের শিল্পের জন্য 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'?
এমন একটি সময়ে নয়াদিল্লির তরফে এই পদক্ষেপ নেওয়া হল যখন বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশি স্পিনিং মিল মালিকরা ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন। কারণ ভারত থেকে সস্তা, শুল্কমুক্ত সুতা আমদানি তাঁদের স্থানীয় উৎপাদনের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলে বাংলাদেশি টেক্সটাইল মিলগুলি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
কেন ধর্মঘটে বাংলাদেশের বস্ত্র খাত?
আসলে বাংলাদেশের গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি বহু বছর ধরেই ভারতের তৈরি কার্পাস সুতো এবং চিনের পলিয়েস্টার সুতোর উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে তৈরি সুতোর তুলনায় এগুলির দাম তুলনামূলকভাবে কম। মানেও উন্নত। সেই কারণেই সেদেশে তৈরি সুতো ছেড়ে বিদেশ থেকেই আমদানির প্রবণতা। বস্ত্র প্রস্তুককারকদের সুবিধার্থে তাই সুতো আমদানিতে কোনও ট্যাক্সও নেয় না বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু সেদেশের সুতো মিলের মালিকদের দাবি, এর ফলে তাঁরা চরম আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়ছেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (BTMA)-এর দাবি, সস্তায় ভারতীয় সুতোয় বাজার ছেয়ে গিয়েছে। এর ফলে তাঁদের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতো গুদামেই পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ৫০টিরও বেশি মিল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। গলা অবধি ধার দেনায় ডুবে মিল মালিকরা।