প্রতীকী ছবি বৃহস্পতিবার সংসদে পেশ করা হয়েছে অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-২৬। সেখানে বলা হয়েছে, ভারতে ডিজিটাল আসক্তি ও স্ক্রিন সংক্রান্ত মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এই প্রবণতাকে উদ্বেগজনক বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন গেমিং এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে সুস্থতা, শিক্ষার ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। রিপোর্টে ডিজিটাল আসক্তিকে এমন একটি আচরণগত প্রবণতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যেখানে ডিজিটাল ডিভাইস ও অনলাইন কার্যকলাপের প্রতি অতিরিক্ত, স্থায়ী বা বাধ্যতামূলক নির্ভরতা মানসিক চাপ ও দৈনন্দিন কার্যক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটায়।
সমীক্ষা অনুযায়ী, এই ধরনের আচরণের ফলে মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের অভাব, উদ্বেগ এবং পড়াশোনা বা কর্মক্ষেত্রে কর্মদক্ষতার অবনতি দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতির কারণে বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষয় হয়, সামাজিক অংশগ্রহণ কমে যায় এবং সামাজিক দক্ষতা কমতে থাকে।
ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রভাবের পাশাপাশি, রিপোর্টে ডিজিটাল আসক্তির বিস্তৃত অর্থনৈতিক ক্ষতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ অনলাইন খরচ, গেমিং ও সাইবার জালিয়াতির কারণে সরাসরি আর্থিক ক্ষতি, পাশাপাশি কর্মসংস্থানের যোগ্যতা হ্রাস, উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া এবং আজীবন আয়ের সম্ভাবনা কমে যাওয়ার মতো পরোক্ষ ক্ষতি।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ব্যবহারের সঙ্গে উদ্বেগ, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা ও ঘুমের সমস্যার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে পড়াশোনার চাপের মধ্যে থাকা শিক্ষার্থী এবং সাইবার বুলিং এবং উত্তেজক ডিজিটাল কনটেন্ট নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করায় এই সমস্যায় বেশি দেখা যায় তরুণদের মধ্যে।
সমীক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত আসক্তির সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মসম্মানবোধের অভাব, সাইবার বুলিং-জনিত চাপ এবং আত্মহত্যার ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।
ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণার উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যে এই সমস্যাগুলির প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত বেশি।
এই ঝুঁকির পরেও ডিজিটাল ব্যবহারের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৪ সালে ভারতের প্রায় অর্ধেক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী অনলাইন ভিডিও দেখেছেন। ৪৩ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেছেন, ৪০ শতাংশ ইমেল ব্যবহার বা মিউজিক স্ট্রিম করেছেন এবং ২৬ শতাংশ ডিজিটাল পেমেন্ট করেছেন। সংখ্যার হিসাবে, প্রায় ৪০ কোটি মানুষ ওটিটি ভিডিও ও ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন এবং প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়।
এর ফলে, সমীক্ষার মতে, ভারতের তরুণ প্রজন্ম একটি অত্যন্ত ডিজিটাল পরিবেশে বেড়ে উঠছে।
যদিও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার শিক্ষালাভ, কর্মসংস্থান ও নাগরিক অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তবুও সমীক্ষা বলছে—১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এখন আর ডিজিটাল অ্যাক্সেস বড় সমস্যা নয়, কারণ এই গোষ্ঠীর মধ্যে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার প্রায় সর্বজনীন।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমীক্ষায় একাধিক কাঠামোগত হস্তক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাইবার সুরক্ষা শিক্ষা, পিয়ার-মেন্টর কর্মসূচি, স্কুলে বাধ্যতামূলক শারীরিক শিক্ষা, স্ক্রিন-টাইম নিয়ন্ত্রণে অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ, বয়স অনুযায়ী ডিজিটাল অ্যাক্সেস নীতি এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট হোস্ট করা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলির জবাবদিহি বাড়ানো।
সমীক্ষায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া শিশুদের ডিজিটাল আসক্তি রোধে বিশ্বের অন্যতম কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে নির্দিষ্ট বয়সের নীচে শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।