আবার ই১০ ফেরানো নিয়ে আলোচনাপেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো নিয়ে চলছে বিতর্ক। তবে E20 নিয়ে অনড় সরকার। এখন E10 নিয়ে ফের কথা শুরু হয়েছে। E20 মানে পেট্রোলের সঙ্গে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে সারা দেশে বিক্রি হওয়া পেট্রোলের স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে E20 এনেছিল কেন্দ্র। শুধু এতেই থেমে থাকার কথা নয়, ভবিষ্যতে আরও বেশি ইথানল মেশানোর কথাও একাধিক বার বলেছেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গডকড়ি। কিন্তু গত কয়েক মাসে E20 নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও নানা প্রশ্ন। পুরনো গাড়িতে মাইলেজ কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের উপর প্রভাব পড়বে কিনা, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। যদিও কেন্দ্র বারবার জানিয়েছে, E20 নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।
একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পুরনো গাড়িগুলির কথা মাথায় রেখে ই২০-এর পাশাপাশি পেট্রল পাম্পে ই১০-ও রাখা যায় কিনা, তা নিয়ে সরকার ও তেল বিপণন সংস্থাগুলির মধ্যে মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থাৎ যে E10 ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে সরকার এত দিন আপত্তি জানিয়েছিল, এখন সেই E10 নিয়েই আলোচনা চলছে। তা হলে কি E20 নিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসছে কেন্দ্র? আর যদি E10 ফিরিয়ে আনতেই হয়, তা হলে শুধু সিদ্ধান্ত বদলের প্রশ্ন নয়, পেট্রোল পাম্পে E10 পৌঁছে দেওয়া কতটা কঠিন, সেটাও এখন বড় প্রশ্ন।
ভারত নির্ধারিত সময়ের ৫ বছর আগেই গত বছর পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ফেলেছে। কিন্তু E20 চালু হওয়ার পর থেকেই পুরনো গাড়ি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের আগে তৈরি বা বিক্রি হওয়া এমন বহু গাড়ি রয়েছে, যেগুলি E20 জ্বালানির কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়নি। অনেকেই মাইলেজ কমে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। পুরনো গাড়ির ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের উপর প্রভাব পড়বে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কেন্দ্রের বক্তব্য ছিল, পুরনো গাড়িতে মাইলেজ কমলেও তা সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৫ শতাংশের মতো হতে পারে। E20 ব্যবহারের অন্যান্য সুবিধা তার তুলনায় অনেক বেশি। ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার অভিযোগও সরকার মানেনি। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কোনও পুরনো গাড়ি যদি E20 ব্যবহারের জন্য সার্টিফায়েড না হয়, তা হলে সেই গাড়ির মালিক E10 বা কম ইথানলযুক্ত পেট্রোলের বিকল্প পাবেন না কেন?
জুলাইয়ে এই প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্র জানিয়েছিল, সারা দেশে নানা ধরনের পেট্রোল সরবরাহ করা সমস্যার। এতে খরচ বাড়বে। দেশের জ্বালানি জোগানও কমে যেতে পারে। কেন্দ্রের আরও বক্তব্য ছিল, E20 তুলনামূলক ভাবে পরিষ্কার ও উন্নত জ্বালানি। E20 চালু করার জন্য ইতিমধ্যেই বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। ফলে কম ইথানলযুক্ত জ্বালানিতে ফিরে যাওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।
কেন্দ্রের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরনেরও সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর অভিমত,E20-এর পাশাপাশি E10-ও বাজারে রাখা যেতে পারে। এনিয়ে আলোচনা চলছে।
এখন প্রশ্ন, E10 দরকার কার?
অটোমোবাইল শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর তৈরি ও বিক্রি হওয়া পেট্রোলচালিত গাড়িগুলিকে E20 সক্ষম হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু তার আগে বিক্রি হওয়া বিপুল সংখ্যক গাড়ি E20-এর জন্য সার্টিফায়েড নয়।
পেট্রোল গাড়ির আয়ু ১৫ বছর। অর্থাৎ ২০২২ সালে কেনা কোনও পেট্রল গাড়ি এখনও বহু বছর রাস্তায় চলবে। নতুন গাড়ি E20-এর উপযোগী হলেও পুরনো গাড়ির ক্ষেত্রে যদি E10-ই উপযুক্ত হয়, তা হলে এই পরিবর্তনের সময় দুই ধরনের গাড়ির জন্য জ্বালানির বিকল্প কী হবে, সেই প্রশ্ন উঠছে।
কিন্তু এখানেই আসল সমস্যা।
ধরা যাক, সরকার E10-এর বিকল্প চালু করতে চাইল। তা হলে কি পেট্রোল পাম্পে শুধু E20-এর বদলে E10 ঢেলে দিলেই কাজ শেষ? একেবারেই নয়।
বিষয়টি বুঝতে হলে পেট্রোল উৎপাদনের প্রসেসটা বুঝতে হবে।
প্রথমে দেশে আসে অপরিশোধিত তেল। তা যায় রিফাইনারিতে। পরিশোধন করে পেট্রোলের বেস ফুয়েল তৈরি হয়। যাকে মোটর স্পিরিট বলা হয়। এর পর রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই জ্বালানি যায় টার্মিনাল বা ডিপোয়। সেখানেই পেট্রোলের সঙ্গে ইথানল মেশানো হয়। ইন্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম, ভারত পেট্রোলিয়ামের মতো তেল সংস্থাগুলি এই কাজ করে। সেই পেট্রোল যায় রোড ট্যাঙ্কারে। ট্যাঙ্কার পৌঁছয় পেট্রোল পাম্পে। সেখানে জ্বালানি ঢোকে মাটির নীচে থাকা স্টোরেজ ট্যাঙ্কে। সেই পেট্রোল পৌঁছে যায় আপনার গাড়ি বা বাইকে।
E20-এর জন্য এখন এই গোটা ব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট অনুপাত অনুযায়ী কাজ করছে। এখন যদি বড় পরিসরে E10-ও বিক্রি করতে হয়, তা হলে একই ব্যবস্থায় আরও একটি জ্বালানির ভ্যারিয়েন্ট সামলাতে হবে।
কিছু শহরে এমন তেলের পাম্প অবশ্যই রয়েছে, যেখানে প্রিমিয়াম পেট্রোলের দু’-তিনটি ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যায়। কিন্তু সেই জ্বালানির চাহিদা তুলনামূলক ভাবে কম। E10-এর বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। পুরনো গাড়ির জন্য যদি বড় মাত্রায় E10 বিক্রি করতে হয়, তা হলে তার চাহিদা যথেষ্ট বেশি হবে। কার্যত E10-এর জন্য একটি সমান্তরাল সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রথমেই আসবে স্টোরেজের প্রশ্ন। দেশের অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পে পেট্রোলের জন্য একটি বা দুটি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টোরেজ ট্যাঙ্ক থাকে। একই পাম্পে E10 এবং E20, দু'ধরনের পেট্রোল রাখতে হলে আলাদা স্টোরেজ ট্যাঙ্কের প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, দুই ধরনের জ্বালানি যাতে কোনওভাবেই একে অপরের সঙ্গে মিশে না যায়, তাও নিশ্চিত করতে হবে।
এরপর রয়েছে ট্যাঙ্কারের বিষয়টি। ইন্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম, ভারত পেট্রোলিয়ামের মতো তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে E10 এবং E20-এর জন্য আলাদা জ্বালানি পরিবহণের ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে বড় সমস্যা হতে পারে ক্রস কনটামিনেশন। অর্থাৎ সরবরাহ ব্যবস্থার কোনও পর্যায়েই যাতে E10 এবং E20 ভুল করে একে অপরের সঙ্গে মিশে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
E10 আর E20 একইসঙ্গে কেন খরচসাপেক্ষ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, E10 ফিরিয়ে আনতে হলে মূলত তিনটি বড় জায়গায় নতুন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
প্রথমত, যে টার্মিনালে রিফাইনারি থেকে আসা পেট্রোল ও ইথানল মেশানো হয়, সেখানে E10-এর জন্য আলাদা পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্লেন্ডিংয়ের পর সেই জ্বালানি পরিবহণের জন্যও আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। ট্রাক, রেল বা পাইপলাইন, যে মাধ্যমেই জ্বালানি পাঠানো হোক না কেন, E10 এবং E20 আলাদা রাখা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, পেট্রোল পাম্পগুলিতেও নতুন পরিকাঠামো তৈরি করতে হতে পারে। নতুন ট্যাঙ্ক বসাতে হবে, যার জন্য প্রতিটি পাম্পেই বিপুল খরচ হতে পারে।
মোদ্দা বিষয়টি খরচসাপেক্ষ। প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে।
তাহলে সরকার E20 থেকে পিছিয়ে আসছে?
এখনই এমনটা বলা যাবে না। আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে। প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার নিবন্ধটিও তাঁর ব্যক্তিগত মত হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, E20 নিয়ে সরকারের অবস্থান এখন আর আগের মতো একেবারে অনড় বলে মনে হচ্ছে না।