সোনার দোকানে গয়না কিনছেন এক মহিলা- পিটিআই ফাইল ছবিসোনার দাম হু হু করে পড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই রেকর্ড হারে দাম কমছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের স্বর্ণ ঋণ বা গোল্ড লোনের বাজারে কী অবস্থা? রেকর্ড উচ্চতা থেকে সোনার দাম কিছুটা কমলেও, ভারতে গোল্ড লোনের বাজারে তার কোনও প্রভাব পড়েনি। বরং সোনার দাম কমতে শুরু করার পরেও গোল্ড লোনের চাহিদা এবং ঋণ প্রদানের গতি একই রকম জোরালো রয়েছে। তবে এই দ্রুত সম্প্রসারণের মাঝেই একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসছে, যদি দীর্ঘ সময় ধরে সোনার দাম কমতেই থাকে, তাহলে কি এই বৃদ্ধির হার ধরে রাখা সম্ভব হবে? নাকি গোল্ড লোন শিল্প বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে?
স্বল্পমেয়াদে সোনার দাম আরও কিছুটা কমতে পারে
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের (RBI)-এর ফাইন্যান্সিয়াল স্টেবিলিটি রিপোর্ট (FSR) বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, ভারতের গোল্ড লোন সেক্টর এখনও পর্যন্ত শক্ত ভিতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে, সোনার দামের এই রকম খামখেয়ালি বাজারেও। তবে একই সঙ্গে বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিল মনে করছে, স্বল্পমেয়াদে সোনার দাম আরও কিছুটা কমতে পারে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক, বিনিয়োগকারী এবং ভারতের মতো বড় বাজারে সোনার স্থায়ী চাহিদা থাকায় দামের বড়সড় এবং দীর্ঘস্থায়ী পতনের সম্ভাবনা খুবই কম।
বর্তমানে যা ট্রেন্ড, তাতে দেখা যাচ্ছে, ভারতের সবচেয়ে দ্রুত হারে যেসেক্টরগুলি বাড়ছে, তারমধ্যে অন্যতম গোল্ড লোন। ইলারা সিকিউরিটিজ-এর ডেটা অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের মধ্যে ভারতে গোল্ড লোনের বাজারে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার (CAGR) ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ। যা গৃহঋণ বাদে অন্যান্য খুচরো ঋণের বৃদ্ধির হারের প্রায় দ্বিগুণ। বিশেষ করে নন-ব্যাঙ্কিং ফানান্সিয়াল কোম্পানি (NBFC)গুলির ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তাদের গোল্ড লোন পোর্টফোলিও বছরে প্রায় ৯৬.৫ শতাংশ বেড়েছে, যা গোটা শিল্পের গড় ৫৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি।
সাধারণত সোনার দামে বড় ধরনের পতন হলে ঋণদাতা সংস্থাগুলির কাছে বন্ধক রাখা সোনার মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত জামানত চাওয়া হতে পারে, অথবা প্রয়োজন হলে বন্ধক রাখা সোনার গয়না নিলামে তোলার মতো পদক্ষেপও নিতে পারে ঋণদাতা সংস্থাগুলি।
অ্যাভারেজ লোন টু ভ্যালু ৬০ শতাংশের নীচে
আরবিআই ডেটা বলছে, গোল্ড লোনের অ্যাভারেজ লোন টু ভ্যালু (বন্ধকী মূল্যের বদলে ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ যত শতাংশ ঋণ মেলে) ৬০ শতাংশের নীচে। তার ফলে সোনার দাম কমলেও ঋণপ্রদানকারী সংস্থাগুলির ঝুঁকি কমই থাকছে। সমান গুরুত্বপূর্ণ আর একটি বিষয় হল, নতুন ঋণগ্রহীতাদের অংশ অত্যন্ত কম। মোট গোল্ড লোনের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ এমন গ্রাহকদের দেওয়া হয়েছে, যাঁদের আগে কোনও ঋণের রেকর্ড ছিল না। অর্থাৎ বেশিরভাগ ঋণগ্রহীতারই আগের ঋণ পরিশোধের একটি প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস রয়েছে, যা ঋণদাতাদের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এছাড়া, NBFC গুলির খেলাপি ঋণের হার সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। একই সঙ্গে তাদের মূলধন পর্যাপ্ততার হার প্রায় ২৪.৬ শতাংশ, যা আর্থিকভাবে অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক অবস্থান বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে যদি আগামী দিনে সোনার দামে কিছুটা সংশোধন বা পতনও হয়, তবুও গোল্ড লোন শিল্প সেই ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো শক্ত অবস্থান থেকেই নতুন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারবে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দেখে সোনার দামে বড়সড় ধস নামার আশঙ্কা নেই। তাদের মূল অনুমান, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বজায় থাকলে সোনার দাম মোটামুটি ৫ শতাংশ ওঠানামার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে যদি বিশ্ব অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হয়, সুদের হার বাড়ে এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, তাহলে সোনার দামে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সংশোধন হতে পারে।
সোনার দাম কি ফের বাড়তে পারে?
যুদ্ধ, সংঘর্ষ ইত্যাদির ফলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে বা বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধির হার দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা আবারও বেড়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সোনার দামে ফের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিতে পারে। WGC আরও বলছে, সোনার দাম যদি ১০ থেকে ১৫ শতাংশও কমে তবুও তার পর আরও বড় পতনের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, দাম কমলেই সাধারণ ক্রেতা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সোনা কেনার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে বাজারে সোনার দামের জন্য একটি স্বাভাবিক সাপোর্ট তৈরি হয়। বিশেষ করে ২০২২ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১,০০০ টন সোনা কিনছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের জন্য দীর্ঘমেয়াদী শক্ত ভিত তৈরি করেছে।