LIC এর কতটা মালিকানা বেচে দিল সরকার? এর পিছনে খেলা জানুন সহজ ভাষায়

এলআইসিতে অংশীদারিত্ব কমাতে অফার ফর সেল এনেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। নতুন কোনও শেয়ার বাজারে ছাড়া হয়নি। আগে থেকে অংশীদারের হাতে থাকা শেয়ারের কিছু অংশ আমজনতাকে বিক্রি করা হচ্ছে। এলআইসির ক্ষেত্রে তা কেন্দ্রীয় সরকার।

Advertisement
LIC এর কতটা মালিকানা বেচে দিল সরকার? এর পিছনে খেলা জানুন সহজ ভাষায়এলআইসির শেয়ার বেচার তাৎপর্য জানুন।
হাইলাইটস
  • এলআইসিতে নিজেদের অংশীদারিত্ব বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
  • এই সিদ্ধান্তের পিছনে কারণ জানুন।

লাইফ ইন্সুরেন্স কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (LIC)। ভারতের সবথেকে বিশ্বস্ত সংস্থাগুলির তালিকা করতে বললে যে নামটা প্রথমেই মুখে আসবে! সেই এলআইসির (LIC) শেয়ার কেন বিক্রি করছে সরকার? বহু মানুষের কাছে এলআইসি মানে সন্তানের পড়াশোনার টাকা জোগাড়, চাকরি শেষে অবসরকালীন নিরাপত্তা বা কঠিন সময়ে পরিবারের অন্যতম ভরসা। এবার সেই আশ্রয়েরই একটি অংশ বিক্রি হতে চলেছে। আসল খবরটা হল, এলআইসিতে নিজেদের শেয়ারের আরও একটি অংশ বিক্রি করার সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের। কেন এলআইসিতে নিজেদের বড় অংশের শেয়ার বিক্রি? চলুন জেনে নেওয়া যাক

এলআইসির অংশীদারিত্ব বিক্রি

এলআইসিতে নিজেদের অংশীদারিত্ব কমাতে অফার ফর সেল (OFS) এনেছে কেন্দ্র। অফার ফর সেল মানে সংস্থা নতুন কোনও শেয়ার বাজারে ছাড়ছে না, বরং আগে থেকেই বড় অংশীদারের কাছে থাকা শেয়ারের কিছু অংশ আমজনতাকে বিক্রি করা হচ্ছে। এখানে বড় অংশীদার বলতে খোদ সরকার। অর্থাৎ বিক্রির এই টাকা এলআইসির তহবিলে যাবে না, যাবে সরকারি রাজকোষে। এর মাধ্যমে প্রথমে ২.৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করছে সরকার। তবে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে চাহিদা ভালো থাকলে গ্রিন শু অপশনের (Green Shoe Option) মাধ্যমে আরও ৪ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার বিক্রি করা যেতে পারে। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে বাজারে আসতে পারে সর্বোচ্চ ৬.৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব। 

গ্রিন শু অপশনের অর্থ সহজ, প্রত্যাশার চেয়ে চাহিদা বেশি থাকলে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কিছুটা বেশি শেয়ার বিক্রি করা। এই অফার ফর সেলের প্রতি শেয়ারের ন্যূনতম মূল্য বা ফ্লোর প্রাইস রাখা হয়েছে ৩৮২ টাকা। ফ্লোর প্রাইস অর্থাৎ সেই সর্বনিম্ন দাম, যার নীচে শেয়ার বিক্রি করা যাবে না। 

এলআইসির শেয়ারের দামে পতন

দিন দুই আগেও এলআইসির শেয়ারদর ঘোরাফেরা করছিল ৪২৪ টাকার কাছাকাছি। এক ধাক্কায় এলআইসির শেয়ার দর পড়ে যায় প্রায় ৮.৫ শতাংশ। দাম নেমে আসে ৩৯০ টাকার ঘরে। সরকারের অফার প্রাইস শেয়ার প্রতি ৩৮২ টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের টানতে প্রায় ১০ শতাংশ ছাড়েই নিজের শেয়ার বিক্রি করছে কেন্দ্র। পরিকল্পনা অনুযায়ী সব চললে বিক্রির মাধ্যমে সরকার তুলে নিতে পারে প্রায় ৩১,৪০০ কোটি টাকা।

Advertisement

শেয়ার বিক্রির কারণ কী?

কিন্তু আচমকা এলআইসি-র শেয়ার বিক্রি করার কারণ কী? সরকার কি তবে এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ওপর থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিচ্ছে? উত্তর, না। আসল কারণ বুঝতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে ৪ বছর আগে।

২০২২ সালে সরকার প্রথমবার এলআইসিকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করে। যাকে বলা হয় আইপিও। আইপিওর মাধ্যমে কোনও সংস্থা প্রথমবার সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রির সুযোগ দেয়। ২০২২ সালে সেই আইপিওতে ৩.৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব বিক্রি করেছিল সরকার। প্রতি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯৪৯ টাকা। খুচরো বিনিয়োগকারী এবং এলআইসি পলিসিহোল্ডারদের দেওয়া হয়েছিল বিশেষ ছাড়ও। ৭০ বছর ধরে ভারতের প্রতি কোণায় ছড়িয়ে থাকা এই সংস্থার ওপর মানুষের আস্থা ছিল অগাধ। তবে শেয়ার বাজার শুধু আস্থায় চলে না, চলে মুনাফায়। লিস্টিংয়ের পর শেয়ার বাজারে এলআইসির পারফরম্যান্স প্রত্যাশামতো হয়নি। 

৪ বছর পর ফের কেন শেয়ার বিক্রি? 

এবার গল্পটা শুধু মূলধন তোলার নয়, নেপথ্যে রয়েছে শেয়ার বাজারের কড়া নিয়ম। শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবির (SEBI) নিয়ম অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলিতে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকা বাধ্যতামূলক। একে বলা হয় মিনিমাম পাবলিক শেয়ারহোল্ডিং (MPS)। ২০২২ সালে সরকার মাত্র ৩.৫ শতাংশ শেয়ার বেচেছিল। তাই নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাধারণ মানুষের অংশীদারিত্ব ১০ শতাংশে করতেই সরকারের এই ওএফএস আনার পদক্ষেপ।

এলআইসি কেন এত বড় চর্চার বিষয়? 

উত্তর লুকিয়ে প্রায় ৭০ বছর আগের এক সিদ্ধান্তে। ফিরে যাওয়া যাক ১৯৫৬ সালে। স্বাধীনতার বয়স তখন দশও ছোঁয়নি। ব্যাঙ্কিং, ইস্পাত, কয়লা বা বিমা, দেশের অর্থনীতি গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকার চাইছিল এমন কিছু ক্ষেত্র তৈরি হোক যা কেবল মুনাফা কামাবে না, বরং দেশসেবায় কাজে লাগবে। সেই সময় ভারতে কাজ করছিল ২৪৫টি জীবনবিমা সংস্থা ও প্রভিডেন্ট সোসাইটি। ছোট-বড় নানা সংস্থার নীতি ও ট্রাস্ট নিয়ে ছিল হরেক সমস্যা। সেই সব সংস্থাকে একত্রিত করে তৈরি করা হয় একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান, লাইফ ইনসিওরেন্স কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (LIC)।

বাজারে টাকা খাটায় এলআইসি

আপনার জমা দেওয়া প্রিমিয়ামের টাকা এলআইসি শুধুই সিন্দুকে ভরে রাখে না। সরকারি বন্ড, শেয়ার বাজার এবং পরিকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয় সেই অর্থ। সেই বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয়ের ওপর ভিত্তি করেই গ্রাহকদের দাবি ও মেয়াদের টাকা মেটানো হয়। অর্থাৎ এলআইসির পুরো মডেলটাই দাঁড়িয়ে রয়েছে মানুষের বিশ্বাসের ওপর। তবে এর পিছনে শুধু আবেগ নয়, রয়েছে চোখ ধাঁধানো পরিসংখ্যানও। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের ইনভেস্টর প্রেজেন্টেশন অনুযায়ী, এলআইসি-র অ্যাসেট আন্ডার ম্যানেজমেন্ট (AUM) সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫৭ লক্ষ কোটি টাকা। আজও ভারতের জীবনবিমা বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ দখল করে রয়েছে এই সংস্থা।

বেসরকারিকরণ ও বিলগ্নিকরণের ফারাক

তা সত্ত্বেও কেন এই সংস্থায় নিজেদের অংশীদারিত্ব কমাচ্ছে সরকার? এটা কি স্রেফ টাকা তোলার কৌশল? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য অর্থনৈতিক যুক্তি? এখান থেকেই শুরু হয় বেসরকারীকরণ (Privatisation) এবং ডিসইনভেস্টমেন্টের (Disinvestment) ফারাক।

ডিসইনভেস্টমেন্ট হল কোনও সংস্থায় সরকারের থাকা শেয়ারের কিছুটা অংশ বেচে মূলধন জোগাড় করা। এর অর্থ এই নয় যে সংস্থার নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতছাড়া হয়ে গেল। অন্যদিকে, বেসরকারিকরণ হল সংস্থার পুরো নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয় কোনও বেসরকারি সংস্থার হাতে। এলআইসির ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। সরকার এখনও সংস্থায় সবথেকে বড় অংশীদার। এই ওএফএস প্রক্রিয়ার পরেও সরকারই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী থাকবে।

সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে মত 

এই সিদ্ধান্তের সমর্থনে যাঁরা বলছেন, তাঁদের যুক্তি, সরকারি সংস্থা শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হলে প্রতি তিন মাসে আর্থিক ফল প্রকাশ করতে হয়। ফলে সংস্থার স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়ে। লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও বাজারের নজর থাকায় কাজকর্মে গতি আসে।

Advertisement

অন্য দিকে, সমালোচকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের মতে, এলআইসি শুধু একটি সাধারণ সরকারি সংস্থা নয়, এটি জনহিতকর প্রতিষ্ঠান। 

বাজারের চাপ বাড়লে আগামী দিনে কি সংস্থাটির জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়বে? উত্তর সময় দেবে। তবে এ কথা স্পষ্ট, ১৯৫৬ সালের এলআইসি আর আজকের এলআইসি এক নয়। তখন তারা শুধু বিমা বিক্রি করত, আজ তারা শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত অন্যতম বৃহৎ সংস্থা। তখন মানুষ ছিলেন শুধুই পলিসি হোল্ডার, আর আজ অনেকেই এর শেয়ারহোল্ডার।

TAGS:
POST A COMMENT
Advertisement