এলপিজি সিলিন্ডারে চার্জ বসানোর প্রস্তাব বিবেচনা করছে কেন্দ্র।মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। সেই আঁচ পড়েছে ভারতের বাজারে। দাম বেড়েছে পেট্রোল-ডিজেল থেকে রান্নার গ্যাসের। আবারও বাড়তে পারে রান্নার গ্যাস এবং গাড়িতে ব্যবহৃত সিএনজির দাম। সৌজন্যে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি বিবেচনাধীন প্রস্তাব। যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর 'হ্যাঁ' বলার অপেক্ষায়। কী সেই প্রস্তাব? কেন বাড়তে পারে রান্নার গ্যাসের দাম? পড়ে ফেলুন পুরো প্রতিবেদন।
আসলে ইরানে সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতে জ্বালানির 'কৌশলগত ভাণ্ডার', সহজ ভাষায় 'আপৎকালীন মজুত ক্ষমতা' বহুগুণ বাড়ানোর প্ল্যান করেছে মোদী সরকার। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, প্রস্তাবিত এই বৃহৎ পরিকল্পনায় ব্যয় হতে পারে প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪ লক্ষ কোটি টাকা।
সরকারের পরিকল্পনা কী?
সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই তেলের ভাণ্ডার রয়েছে দেশে। এবার প্রথমবারের মতো গ্যাসের ক্ষেত্রেও এই ধরনের মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। নয়া রূপরেখা অনুযায়ী, ২ মাসের চাহিদামতো অপরিশোধিত তেল, LNG (লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস) এবং অন্তত ৬ সপ্তাহের দরকারে এলপিজি মজুত রাখা হবে। যাতে সংকটকালে চাহিদা মেটানো যায়। প্রকল্পের খসড়া রূপরেখা ইতিমধ্য়েই তৈরি। যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায়।
খরচ কে দেবে?
পরিকল্পনা তো তৈরি। কিন্তু এত বড় ভাণ্ডারের জন্য দরকার টাকা। কোত্থেকে আসবে? এটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। সাধারণ গ্রাহকদের উপর অতিরিক্ত সারচার্জ চাপিয়ে সেই টাকা জোগাড়ের পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যার সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে আমজনতার পকেটে।
রান্নার গ্যাসে কত টাকা সারচার্জ?
প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনার আওতায় রান্নার গ্যাস এবং প্রাকৃতিক গ্যাস মজুতের পরিকাঠামো গড়ে তুলতে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪, ২৭৫ কোটি টাকা তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই বিপুল অর্থ তোলা হবে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর নির্দিষ্ট হারে অতিরিক্ত চার্জ ধার্য করে। সূত্রের খবর, রান্নার গ্যাসের (LPG) ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে ১.২৯ টাকা হারে লেভি বসানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে একটি সিলিন্ডারের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ১৮ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে প্রতি স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক মিটারে ১.৪৩ টাকা লেভি বসানোর প্রস্তাব রয়েছে। যা থেকে বার্ষিক প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯.৫ হাজার কোটি টাকা আয় হতে পারে। তবে ঠিক কোন মাপকাঠিতে বা প্রক্রিয়ায় এই লেভি আদায় করা হবে, তা নিয়ে মন্ত্রক এখনও চূড়ান্ত কোনও নির্দেশিকা দেয়নি। এই অর্থ মূলত এলপিজি এবং প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত করার পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা হবে। আর অপরিশোধিত তেল এবং স্ট্র্যাটেজিক ফুয়েল রিজার্ভের পুরো খরচ বহন করবে কেন্দ্রীয় সরকারই।
সাধারণ মানুষের পকেটে টান?
প্রস্তাবিত এই লেভি বা সারচার্জ চালু হলে গ্যাসের খরচ এক ধাক্কায় বর্তমান বিলের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাবে। এমনিতে পেট্রোল-ডিজেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠেছে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের। এই পরিস্থিতিতে গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্যবৃদ্ধি যে মোদী সরকারের জন্য স্পর্শকাতর রাজনৈতিক পদক্ষেপ, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
শিল্পক্ষেত্রেও ধাক্কা
এই নিয়ম চালু হলে কেবল সাধারণ মানুষই নয়, প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারকারী শিল্পক্ষেত্রগুলিও বড়সড় ধাক্কা খাবে। সার কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং ইস্পাত শিল্পের মতো ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই ভাণ্ডার?
বর্তমানে ভারতের কাছে প্রায় ৫৩ লক্ষ ৩০ হাজার টন সরকারি মালিকানাধীন কৌশলগত অপরিশোধিত তেলের সঞ্চয় ক্ষমতা রয়েছে। আরও ৬৫ লক্ষ টনের ক্ষমতার পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। তবে রান্নার গ্যাস (LPG) এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) জন্য দেশে এখনও কোনও নির্দিষ্ট মজুত ভাণ্ডার নেই।
অন্য দেশে ভাণ্ডার
এশিয়ার অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলির তুলনায় ভারতের জরুরি জ্বালানি মজুতের পরিমাণ অনেকটাই পিছিয়ে থাকায় এই পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ভারতের সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন এই জরুরি ভান্ডারে যা তেল মজুত থাকে, তা দিয়ে দেশের বড়জোড় ১০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। অথচ জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলির হাতে ১০০ দিনেরও বেশি সময়ের জরুরি জ্বালানি মজুত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
ভারতের লক্ষ্য কী?
জ্বালানির এই ঘাটতি মিটিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত করাই ভারতের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় হঠাৎ জোগান ব্যাহত হলেও যাতে দেশকে মূল্যবৃদ্ধির হাত থেকে রক্ষা করা যায়। সেই উদ্দেশ্যেই গড়ে তোলা হচ্ছে এই দীর্ঘমেয়াদি রক্ষাকবচ।
যদিও এ বিষয়ে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক বা অর্থমন্ত্রকের তরফে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।