ইথালন নিয়ে সরকারের বড় সিদ্ধান্ত।ই২০ পেট্রোল নিয়ে সেই বিতর্ক মনে আছে? কেউ বলছিলেন, গাড়িতে আখের রস ঢালা হচ্ছে। কেউ আবার দাবি করেছিলেন, পেট্রোলের ট্যাঙ্কে জমেছে পিঁপড়ে। এই সব দাবির মধ্যে কতটা সত্যি, কতটা মিথ্যে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে চিনি ও ইথানলের সম্পর্কের মিষ্টত্ব আপাতত কিছুটা কমল। ভাবছেন ই২০ থেকে এবার মুক্তি? একেবারেই নয়। ই২০ কোথাও যাচ্ছে না। কিন্তু যে পদ্ধতিতে চিনি তৈরির কাঁচামাল ব্যবহার করে ইথানল তৈরি হত, আপাতত তা বন্ধ করল কেন্দ্র। আর এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এল, যখন উৎসবের মরসুমে বাড়ি থেকে মিষ্টির দোকান, সর্বত্রই চিনির চাহিদা তুঙ্গে। কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদী সরকার? যে ইথানল উৎপাদনে চিনিকলগুলিকে বছরের পর বছর ধরে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, এখন সেই উৎপাদনেই কেন রাশ টানা হচ্ছে? দেশে কি চিনির ঘাটতি দেখা দিতে চলেছে? আর আখচাষিদেরই বা কী হবে?
কেন্দ্রের নতুন সিদ্ধান্তে ধাক্কা খেয়েছে চিনি শিল্প। সোমবারই শেয়ার বাজারে একাধিক বড় চিনির সংস্থার শেয়ারের দাম ৭ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে গিয়েছিল। ইথানল নিয়ে পুরো খবরের নেপথ্যে রয়েছে ১৬ অক্টোবরের একটি টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি। ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড, ইন্ডিয়ান অয়েল এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি ওই টেন্ডার দিয়েছে। দরপত্র চাওয়া হয়েছে প্রায় ১০,১০০ কোটি লিটার ইথানল কেনার জন্য। কিন্তু ২০২৬-২৭ সালের টেন্ডারে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। ইথানল তৈরির জন্য চিনির ব্যবহার শূন্য রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আখের রস থেকে তৈরি ইথানল সরবরাহের জন্য এবার দরপত্র চাওয়া হয়নি। তবে ভুট্টা, ভাঙা চাল এবং সরকারি গুদামে থাকা উদ্বৃত্ত চাল থেকে তৈরি ইথানল চলবে।
২০২৬-২৭ সালের ইথানলের জোগান বর্ষ বলতে ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে বোঝানো হচ্ছে। পেট্রোলের সঙ্গে মেশানোর জন্য তেল সংস্থাগুলির বিপুল পরিমাণ ইথানল প্রয়োজন হয়। তাই আগে থেকেই উৎপাদকদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়, কোন সংস্থা কতটা ইথানল সরবরাহ করতে পারবে এবং কী শর্তে তা সরবরাহ করা হবে।
এবার ইথানল আসবে কীভাবে?
ইথানল তৈরিতে চিনির ব্যবহারে রাশ টানা হল। এবার প্রশ্ন হল, E20 পেট্রোল চালু রাখতে ইথানল আসবে কোথা থেকে? ইথানল তৈরির জন্য শুধু আখের উপর নির্ভর করতে হয় না। ভুট্টা এবং চালের মতো শস্য থেকেও ইথানল উৎপাদন করা যায়।
অগাস্টে এক কথা, অক্টোবরে উল্টো কেন?
এই গোটা ঘটনার মধ্যে আরও একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। গত ২১ অগাস্ট কেন্দ্রীয় খাদ্য মন্ত্রক একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, ইথানল তৈরিতে চিনির ব্যবহারই দাম বৃদ্ধির কারণ নয়। ২০২২-২৩ মরসুমে উৎপাদিত চিনির প্রায় ১২ শতাংশ ইথানল তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০২৫-২৬ মরসুমে সেই পরিমাণ কমে প্রায় ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। সরকার আরও জানিয়েছিল, দেশে উৎপাদিত ইথানলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এখন শস্য থেকে তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত চিনির মজুতও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু অক্টোবরে ইথানল তৈরিতে চিনির ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। অগাস্টে চিনির জোগান নিয়ে আশ্বাস দেওয়ার মাত্র ২ মাসের মধ্যে পরিস্থিতির এমন কী পরিবর্তন হল, যার ফলে ইথানল কেনার নিয়ম বদলাতে হল? কম উৎপাদনের নতুন পূর্বাভাসের কারণেই কি সরকার আরও সতর্ক হচ্ছে? নাকি আগামী দিনে চিনির মজুত আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে এই পদক্ষেপ?
চিনির দাম কেন বাড়ছে?
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০ জুলাই চিনির গড় খুচরো দাম ছিল কেজিতে ৪৮.১৮ টাকা। ২০ অগাস্ট তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫.৭০ টাকা। এক মাসে দাম বেড়েছিল প্রায় ১৫.৫ শতাংশ। ১৬ অক্টোবর চিনির দাম ছিল কেজিতে ৫৭.৮২ টাকা। প্রশ্ন হল, ভারত আখ উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও চিনির দাম এত বাড়ছে কেন? এর অন্যতম কারণ হল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা। কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মরসুমে প্রথমে চিনির উৎপাদন প্রায় ৩৪৩ লক্ষ টন হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল। পরে সেই হিসাব কমিয়ে প্রায় ৩০৬ লক্ষ টন করা হয়। আসন্ন মরসুমেও উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো-এনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের অনুমান, ২০২৬-২৭ মরসুমে দেশে চিনির উৎপাদন প্রায় ২৮০ লক্ষ টন হতে পারে। গত মরসুমে মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩১০ লক্ষ টন। অর্থাৎ এবার উৎপাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে।
চিনির দাম কি কমবে
ইথানল তৈরিতে চিনির ব্যবহার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আগামী মরসুমে চিনির উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, আগামী দিন থেকেই বাজারে চিনির দাম কমে যাবে। দাম কমা বা বাড়া নির্ভর করবে নতুন মরসুমে আখের ফলন, চিনিকলগুলির উৎপাদন, বাজারে জোগান এবং আমদানির মতো একাধিক বিষয়ের উপর। উৎপাদন বাড়লেও সেই চিনি কত দ্রুত বাজারে পৌঁছচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্য বনাম জ্বালানি
ইথানল নিয়ে এই সিদ্ধান্তের ফলে আবারও সামনে আসছে ফুড ভার্সেস ফুয়েল বিতর্ক। অর্থাৎ একই ফসলকে খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হবে, নাকি জ্বালানি উৎপাদনে? শুধু আখ নয়, ভুট্টার ক্ষেত্রেও এই বিতর্ক প্রাসঙ্গিক। মানুষের খাবারের পাশাপাশি পোলট্রি শিল্পেও ভুট্টা ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে চালের ক্ষেত্রে সরকারের বক্তব্য, মানুষের খাদ্য এবং সরকারি প্রকল্পের প্রয়োজন মেটানোর পর যে উদ্বৃত্ত চাল থাকে, তা দিয়ে তৈরি হয় ইথানল।
কোন ফসলে ইথানল
কয়েক মাস আগেও প্রশ্ন ছিল, পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো হচ্ছে কেন? এখন প্রশ্ন উঠছে, সেই ইথানল তৈরির জন্য দেশের কোন ফসল ব্যবহার করা হবে? আর আগামী দিনে অন্য কোনও ফসলের ঘাটতি দেখা দিলে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে? আপাতত চিনির উৎপাদন এবং ইথানল তৈরির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতেই আখ ও চিনির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। আগামী মরসুমে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব কতটা পড়ে, এখন সেটাই দেখার।