লোন নিয়ে নয়া নিয়ম ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুরক্ষা আরও জোরদার করতে নতুন ও বিস্তৃত নির্দেশিকা জারি করল ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI)। বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির জন্য জারি হওয়া এই নতুন কাঠামোয় ঋণ আদায়ের নিয়ম, রিকভারি এজেন্সির ভূমিকা, গ্রাহকদের অধিকার এবং প্রযুক্তিনির্ভর ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে একাধিক কড়া বিধি বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়ম কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
'রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কস–রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্ট) ফোর্থ অ্যামেন্ডমেন্ট ডিরেকশনস, ২০২৬'-এর অধীনে জারি হওয়া এই নির্দেশিকা আগের বিভিন্ন নির্দেশকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করেছে। তবে এই নিয়ম স্মল ফাইন্যান্স ব্যাঙ্ক, পেমেন্টস ব্যাঙ্ক, রিজিওনাল রুরাল ব্যাঙ্ক (RRB) এবং লোকাল এরিয়া ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
ব্যাঙ্কগুলিকে তৈরি করতে হবে পূর্ণাঙ্গ রিকভারি নীতি
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাঙ্ককে ঋণ আদায়ের জন্য একটি বিস্তারিত নীতি (Recovery Policy) তৈরি করতে হবে। সেখানে উল্লেখ থাকবে কোন পরিস্থিতিতে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে, কীভাবে বিষয়টি ধাপে ধাপে এগোবে, আর্থিক সমস্যায় থাকা গ্রাহকদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করা হবে, রিকভারি এজেন্সি নিয়োগের আগে কী ধরনের যাচাই হবে এবং নিয়ম ভঙ্গের কারণে গ্রাহকের ক্ষতি হলে কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
রিকভারি এজেন্সি নিয়োগের ক্ষেত্রেও কড়া নিয়ম বেঁধে দিয়েছে RBI। ব্যাঙ্ককে আগে যথাযথ যাচাই করতে হবে, নির্দিষ্ট সময় অন্তর রিকভারি এজেন্টদের ব্যাকগ্রাউন্ড পরীক্ষা করতে হবে এবং শুধুমাত্র ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ব্যাঙ্কিং অ্যান্ড ফিন্যান্স (IIBF) বা RBI-অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও শংসাপত্রধারী এজেন্টদেরই ঋণ আদায়ের কাজে লাগানো যাবে।
গ্রাহকদের জন্য বাড়তি সুরক্ষা
নতুন নিয়মে স্বচ্ছতার উপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ব্যাঙ্কগুলিকে নিজেদের ওয়েবসাইটে অনুমোদিত রিকভারি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করতে হবে। কোনও রিকভারি এজেন্ট প্রথমবার গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে যাওয়ার অন্তত এক দিন আগে গ্রাহককে জানাতে হবে। রিকভারি এজেন্সি বদল হলে বা তাদের পরিষেবা বন্ধ হলেও গ্রাহককে তা জানানো বাধ্যতামূলক।
রিকভারি এজেন্টদের পরিচয়পত্র ও অনুমোদনপত্র সঙ্গে রাখতে হবে। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই তাঁরা গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন, যদি না গ্রাহক অন্য সময়ের অনুরোধ করেন। শোকের সময়, চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতি বা অন্য কোনও সংবেদনশীল সময়ে গ্রাহককে বিরক্ত করা যাবে না।
হুমকি, অপমান বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তথ্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা
RBI স্পষ্ট জানিয়েছে, ঋণ আদায়ের নামে কোনও রিকভারি এজেন্ট অশালীন ভাষা ব্যবহার করতে পারবেন না, হুমকি দিতে পারবেন না, বারবার ফোন করে হয়রানি করতে পারবেন না কিংবা পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগ করতে পারবেন না। গ্রাহককে প্রকাশ্যে অপমান করা, তাঁর ঋণের তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা অথবা পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা সহকর্মীদের ভয় দেখানোও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া ব্যাঙ্কগুলিকে এমন কোনও টার্গেট বা ইনসেনটিভ ব্যবস্থা চালু না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে রিকভারি এজেন্টরা অতিরিক্ত চাপ বা অসদাচরণে উৎসাহিত হন।
মোবাইল ফোন লক করার ক্ষেত্রেও কড়া নিয়ম
প্রযুক্তিনির্ভর ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও নতুন সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে RBI। কোনও গ্রাহকের মোবাইল ফোন দূর থেকে লক বা সীমিত করা যাবে না, যদি না সেই ঋণ বিশেষভাবে ওই মোবাইল ফোন কেনার জন্য নেওয়া হয়ে থাকে।
সেক্ষেত্রেও ঋণের কিস্তি বকেয়া হওয়ার ৩০ দিন পর সীমিত বিধিনিষেধ আরোপ করা যাবে এবং ৬০ দিন বকেয়া না হলে সম্পূর্ণভাবে ফোন সীমিত করা যাবে না। তবে কোনও অবস্থাতেই ইনকামিং কল, এসএমএস, জরুরি SOS পরিষেবা বা কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা বন্ধ করা যাবে না।
যদি ব্যাঙ্ক ভুল করে ফোনে বিধিনিষেধ আরোপ করে বা ঋণ শোধের পর সময়মতো সেই বিধিনিষেধ না তোলে, তাহলে গ্রাহককে প্রতি ঘণ্টায় ২৫০ টাকা হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট ঋণের মোট অঙ্কের বেশি হতে পারবে না।
অভিযোগ নিষ্পত্তির পৃথক ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাঙ্ককে ঋণ আদায় সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি, ঋণ আদায় সংক্রান্ত সমস্ত নোটিস বা যোগাযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিষ্পত্তি আধিকারিকের যোগাযোগের তথ্য উল্লেখ করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।