চিনির উৎপাদন কমার আশঙ্কা।২০ জুলাই চিনির গড় খুচরো দাম ছিল কেজিতে ৪৮.১৮ টাকা। ২০ অগাস্ট তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫.৭০ টাকা। মাত্র এক মাসে দাম বেড়েছিল প্রায় ১৫.৫ শতাংশ। ১৬ অক্টোবর চিনির দাম ছিল কেজি প্রতি প্রায় ৫৭.৮২ টাকা। এমনটাই সরকারি পরিসংখ্যান। এতেই স্পষ্ট, ধাপে ধাপে চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী। এবার প্রশ্ন হল, হঠাৎ চিনির দাম মনে করানোর কারণ কী? কারণ চিনির বাজারে নতুন খারাপ খবর। অনিয়মিত বৃষ্টি এবং খরার মতো পরিস্থিতির জেরে চলতি মরসুমে মহারাষ্ট্রে আখের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে রাজ্যের চিনিশিল্পে। ইথানল উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমার আশঙ্কা।
মহারাষ্ট্রে কতটা কমতে পারে চিনির উৎপাদন? মহারাষ্ট্রের চিনি কমিশনার সঞ্জয় কোলতে জানিয়েছেন, গত মরসুমের তুলনায় এবার চিনির উৎপাদন প্রায় ১০ লক্ষ মেট্রিক টন কম হতে পারে। কৃষি দফতর এবং বিশেষজ্ঞ কমিটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি মরসুমে মহারাষ্ট্রে চিনির উৎপাদন থাকতে পারে ৮৯ লক্ষ থেকে ৯০ লক্ষ মেট্রিক টনের মধ্যে। গত মরসুমে এই উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৯৯ লক্ষ মেট্রিক টন। শুধু চিনির উৎপাদনই নয়, আখ মাড়াইয়ের পরিমাণও কমার আশঙ্। গত মরসুমে যেখানে প্রায় ১,০৪৫ লক্ষ মেট্রিক টন আখ মাড়াই হয়েছিল, সেখানে এবার তা কমে প্রায় ৯০০ লক্ষ মেট্রিক টন।
আখের জোগান কমে যাওয়ায় চিনিকলগুলিতে মাড়াইয়ের মরসুমের গড় মেয়াদও কমতে পারে। গত বছর গড়ে ১০৪ দিন মাড়াই চলেছিল। এ বার তা কমে প্রায় ৯০ দিনে দাঁড়াতে পারে। এর ফলে রাজ্যের বিভিন্ন চিনিকলের উৎপাদন এবং আয় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত মরসুমে মহারাষ্ট্রে ২১০টি চিনিকলে আখ মাড়াই হয়েছিল। আসন্ন মরসুমের জন্য এখনও পর্যন্ত ১০৩টি চিনিকল মাড়াইয়ের অনুমতি পেয়েছে। আরও ১০৯টি চিনিকলকে অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
অনিশ্চয়তায় ইথানল প্রকল্প
এখন তো চিনি শুধু মিষ্টি তৈরি কাজে লাগে না। বরং চিনি দিয়ে তৈরি হয় ইথানলও। স্বাভাবিকভাবে চিনির উৎপাদন কমলে ধাক্কা খাবে ইথানল শিল্পও। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের চিনিকলগুলি ইথানল উৎপাদন পরিকাঠামো তৈরিতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। রাজ্যে ইথানল উৎপাদনের মোট ক্ষমতা প্রায় ২৯৬ কোটি লিটার বলে অনুমান। তবে বাস্তবে কতটা ইথানল উৎপাদন ও বিক্রি করা যাবে, তা নির্ভর করে কাঁচামালের জোগান, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি এবং তেল বিপণন সংস্থাগুলির চাহিদার উপর।
চিনির দাম বাড়বে?
এবার প্রশ্ন হল চিনির দাম কি বাড়বে? এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে, ইথানল জ্বালানি তৈরিতে আখের ব্যবহার আপাতত হবে না। ২০২৬-২৭ সালের জন্য এই সিদ্ধান্ত। ফলে আখ এখন থেকে শুধুমাত্র চিনি তৈরিতেই ব্যবহার হবে।
ইথানলের জোগান কীভাবে?
আখ থেকে ইথানল তৈরি হবে না। তার মানে এটা নয় যে ইথানল উৎপাদনই বন্ধ। দেশে তেল বিপণন সংস্থাগুলির ইথানলের চাহিদা প্রায় ১১০০ কোটি লিটার। এর মধ্যে মহারাষ্ট্রের চাহিদা প্রায় ১০০ কোটি থেকে ১২০ কোটি লিটার। প্রতি বছর উৎপাদিত চিনির প্রায় ৯ শতাংশ ইথানল তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আখের রস, সিরাপ এবং বি হেভি মোলাসেস থেকে তৈরি ইথানল কেনার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান নীতিতে থাকা বিধিনিষেধের জেরে উৎপাদকদের বিকল্প সীমিত হতে পারে। ফলে চিনিকলগুলিকে সি-হেভি মোলাসেস এবং শস্যভিত্তিক ইথানল উৎপাদনের উপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। একদিকে আখের জোগান কমার আশঙ্কা, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নীতির বিধিনিষেধ, এই দুইয়ের জেরে ইথানল উৎপাদকদের উপর চাপ বাড়তে পারে। ফলে বিপুল বিনিয়োগের প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিল্পমহলে।
আখচাষিদের পাওনা মেটেনি
অন্যদিকে গত মরসুমে মাড়াই করা ২১০টি চিনিকলের মধ্যে ৯৯.৭১ শতাংশ চিনিকল আখচাষিদের ন্যায্যমূল্য মিটিয়ে দিয়েছে। তবে এখনও ২১টি চিনিকলের কাছে চাষিদের মোট ১১৯ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে জানিয়েছেন কোলতে। বকেয়া মেটানোর জন্য ওই চিনিকলগুলির মধ্যে ১২ থেকে ১৩টি ইতিমধ্যেই চাষিদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বকেয়া টাকা মিটিয়ে দেওয়ার কথা তাদের। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না মেটালে বাকি চিনিকলগুলির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়েছেন মহারাষ্ট্রের চিনি কমিশনার।