পেনশন ফান্ডসোনা শুধু গয়না বা সঞ্চয়ের মাধ্যম নয়, এবার বিশ্বের বড় বড় পেনশন ফান্ডের বিনিয়োগ কৌশলেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিচ্ছে। করোনা পরবর্তী সময়ে মূল্যবৃদ্ধি, বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং শেয়ার-বন্ডের পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তনের মতো একাধিক কারণে বিনিয়োগের পুরনো কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সেই জায়গায় পোর্টফোলিওকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে সোনার দিকে ঝুঁকছে কিছু বড় পেনশন ফান্ড।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের একটি রিপোর্টে নেদারল্যান্ডস, আমেরিকা, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি পেনশন ফান্ডের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এই ফান্ডগুলি বিভিন্ন পদ্ধতিতে নিজেদের পোর্টফোলিওতে সোনার অংশ বাড়িয়েছে।
কেন সোনায় বাড়ছে পেনশন ফান্ডের নজর?
পেনশন ফান্ডগুলি শুধুমাত্র সোনার দাম ভবিষ্যতে বাড়বে, এই আশায় বিনিয়োগ করছে না। বরং পোর্টফোলিওর ঝুঁকি কমানো এবং বিভিন্ন ধরনের সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির জন্য সোনাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সোনাকে পোর্টফোলিও ডাইভার্সিফিকেশন, মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি সামলানো, প্রয়োজনের সময়ে তারল্য বজায় রাখা এবং ঝুঁকির তুলনায় ভালো রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনার মতো কারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শেয়ার ও বন্ডের সম্পর্ক। একসময় শেয়ার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে সরকারি বন্ড পোর্টফোলিওকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বন্ড ও ইক্যুইটির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বেড়েছে। ফলে শুধু শেয়ার এবং বন্ডের উপর নির্ভর করে পোর্টফোলিওর ঝুঁকি সামলানো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে সোনার গুরুত্ব বাড়ছে। বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হলে ঐতিহাসিকভাবে সোনার সঙ্গে ইক্যুইটির সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে কম, এমনকী কিছু সময়ে নেতিবাচকও থেকেছে। ফলে পোর্টফোলিওর অন্য সম্পদগুলির সঙ্গে সোনার আচরণ আলাদা হওয়ায় ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নেদারল্যান্ডসের পেনশন ফান্ডে ৫% সোনা
নেদারল্যান্ডসের ৭.৭ বিলিয়ন ইউরোর পেনশন ফান্ড PDN ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে সোনায় বিনিয়োগ শুরু করে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে, ২০২১ সালের এপ্রিল নাগাদ পোর্টফোলিওতে সোনার অংশ ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে যায়।
এই বিনিয়োগ বাড়াতে ফান্ডটি সরকারি বন্ডে নিজেদের এক্সপোজার ১০ শতাংশ কমিয়েছিল। সেই টাকা থেকে অর্ধেক সোনায় বিনিয়োগ করা হয়। বাকি অর্থ ইক্যুইটি, রিয়েল এস্টেট এবং পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হয়।
আমেরিকার ফান্ডে ৩% গোল্ড অ্যালোকেশন
আমেরিকার Fairfax County Employee Retirement Systems-এর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬.২ বিলিয়ন ডলার। এই পেনশন ফান্ড ফিউচার্সের মাধ্যমে সোনায় প্রায় ৩ শতাংশ বিনিয়োগ করেছে।
২০২০ সালে সোনায় বিনিয়োগ শুরু করে এই ফান্ড। সেই সময় করোনা মহামারির পর বিপুল আর্থিক সহায়তা এবং মনিটারি স্টিমুলাসের কারণে ভবিষ্যতে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে পোর্টফোলিওকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে সোনাকে জায়গা দেওয়া হয়।
ব্রিটেনের ফান্ডেও রয়েছে সোনা
ব্রিটেনের Now: Pensions Master Trust ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে প্রথমবার সোনায় বিনিয়োগ করে। বর্তমানে তাদের মোট সম্পদের প্রায় ২ শতাংশ সোনায় রয়েছে। এই ফান্ডও ফিউচার্সের মাধ্যমে সোনায় বিনিয়োগ করে।
এই পেনশন ফান্ডের মোট পোর্টফোলিওর প্রায় ১০ শতাংশ রয়েছে অলটারনেটিভ অ্যাসেটসে। এর মধ্যে সোনা ছাড়াও রয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেটালস, কার্বন ক্রেডিট এবং হাই-ইল্ড অ্যাসেটস।
অস্ট্রেলিয়ার NGS Super-ও সোনায় ভরসা রাখছে
অস্ট্রেলিয়ার NGS Super ২০২০ সালের জুন থেকে নিজেদের পোর্টফোলিওতে প্রায় ৩ শতাংশ সোনার বরাদ্দ বজায় রেখেছে। তাদের বিনিয়োগ কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হল বিভিন্ন ধরনের সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে বিভিন্ন বাজার পরিস্থিতির ঝুঁকি সামলানো।
ইক্যুইটি, সরকারি বন্ড, অলটারনেটিভ অ্যাসেটস এবং সোনাকে একসঙ্গে রেখে পোর্টফোলিও তৈরি করা হয়েছে। ফলে কোনও একটি সম্পদের বাজারে বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব কিছুটা সামলানোর সুযোগ থাকে।
তাহলে পেনশন ফান্ডে সোনা কেন?
বিশ্বের এই পেনশন ফান্ডগুলির উদাহরণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, সোনায় বিনিয়োগের কোনও একটাই নির্দিষ্ট মডেল নেই। কোনও ফান্ড ২ শতাংশ, কোনওটি ৩ শতাংশ আবার কোনওটি ৫ শতাংশ পর্যন্ত সোনায় বরাদ্দ করেছে।
প্রতিটি ফান্ড নিজেদের লক্ষ্য, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা, গভার্ন্যান্স এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ কৌশল অনুযায়ী সোনার অংশ নির্ধারণ করছে। অর্থাৎ পেনশন ফান্ডগুলির কাছে সোনা এখন শুধু একটি কমোডিটি নয়। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পোর্টফোলিওকে বৈচিত্র্যময় করা এবং ঝুঁকি সামলানোর কৌশলের অংশ হিসেবেও সোনার গুরুত্ব বাড়ছে।