
সময়ের মায়াজাল
মানুষ যখন কোনো ঘড়ি বা প্রাকৃতিক আলোর সংস্পর্শে থাকে না, তখন সে সময়ের সঠিক হিসেব হারিয়ে ফেলে। শপিং মলের ভেতরে নেই কোনো জানলা, নেই কোনো ঘড়ি। ফলে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আপনার অজান্তেই আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মলের ভেতরে ঘুরে বেড়ান। বিপণন বিশেষজ্ঞদের ভাষায় একে বলা হয় ‘গ্রুয়েন ইফেক্ট’। সময়ের বোধ হারিয়ে গেলেই ক্রেতারা বেশি সময় ধরে দোকানে ঘুরে বেড়ান এবং কেনাকাটা করেন।

কেনাকাটার নেশা
মনস্তত্ত্ব বলছে, মানুষের হাতে সময় কম থাকলে সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় এবং নির্দিষ্ট প্রয়োজনে কেনাকাটা করে। কিন্তু যখন সে বুঝতে পারে না কতক্ষণ সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, তখন সে ধীরে সুস্থে সমস্ত দোকান ঘুরে দেখে। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার প্রবণতা বা ‘ইম্পালসিভ বায়িং’ বহুগুণ বেড়ে যায়। ঘড়ি না থাকাটা এখানে ক্রেতার অবচেতন মনকে শান্ত রাখে এবং তাঁকে আরও বেশি কেনাকাটা করতে প্ররোচিত করে।

জানলাবিহীন পরিবেশ
ঘড়ির অভাবের পাশাপাশি শপিং মলগুলোতে জানলা না থাকাও এক পরিকল্পিত ছক। বাইরের রোদের তেজ কমছে কি না বা সন্ধ্যা নামল কি না, তা বোঝার কোনো উপায় থাকে না। জানলা থাকলে সূর্যের অবস্থান দেখে মানুষ সময়ের আন্দাজ করতে পারে। সেই পথ বন্ধ করে দিয়ে কৃত্রিম আলোর মায়াজাল তৈরি করা হয়, যাতে দিন আর রাতের পার্থক্য ঘুচে যায়।

আরামের ফাঁদ
শপিং মলগুলোতে মখমলে সোফা, মনোরম সঙ্গীত আর সুগন্ধী ব্যবহার করা হয়। এর উদ্দেশ্য একটাই— ক্রেতাকে ঘরোয়া আরামের অনুভূতি দেওয়া। এই আরামদায়ক পরিবেশে ঘড়ির টিকটিক শব্দ বিরক্তির কারণ হতে পারে। সময় দেখতে গেলেই ক্রেতার মনে হতে পারে ‘অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে, এবার বাড়ি ফিরতে হবে’। সেই বাড়ির ফেরার তাড়নাটুকু মুছে ফেলতেই ঘড়িকে ব্রাত্য রাখা হয়েছে।

পকেট ফাঁকা করার ছক:
পরের বার যখন কোনো বিলাসবহুল শপিং মলে ঢুকবেন, তখন নিজের ঘড়ির দিকে নজর রাখুন। কারণ, আপনি সেখানে কেবল পণ্য কিনতে যাচ্ছেন না, বরং আপনার মূল্যবান সময়টি এক সুনিপুণ বিপণন কৌশলের কাছে বিক্রি করতে যাচ্ছেন। সময়ের হিসেব আপনার হাতে না থাকলে, দিনশেষে আপনার পকেট যে আরও কিছুটা হালকা হবে, তা বলাই বাহুল্য।

ক্যাসিনোর অনুকরণ
মজার বিষয় হলো, শপিং মলে ঘড়ি না রাখার এই প্রথা আসলে শুরু হয়েছিল ক্যাসিনো বা জুয়া খেলার জায়গাগুলো থেকে। জুয়াড়িরা যাতে হার-জিতের নেশায় সময়ের হিসেব ভুলে মত্ত থাকেন, সেই কৌশলই এখন আধুনিক খুচরো বাজারে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

মোবাইলের যুগ ও চ্যালেঞ্জ
অবশ্য আধুনিক যুগে প্রত্যেকের হাতে স্মার্টফোন থাকায় সময় দেখা এখন এক লহমার ব্যাপার। তবুও দেওয়াল ঘড়ির অনুপস্থিতি ক্রেতার মনে এক ধরণের মানসিক স্থবিরতা তৈরি করে। বড় ঘড়ি চোখে পড়লে সচেতন মন সতর্ক হয়ে যায়, যা মোবাইলের ক্ষেত্রে কিছুটা কম কাজ করে। বিপণন বিশারদদের মতে, একটি বড় ঘড়ি ক্রেতাকে যতটা সচেতন করে, পকেটে থাকা ফোন ততটা বিঘ্ন ঘটায় না।

বড় বড় বিপণনী সংস্থাগুলো জানে, ক্রেতা যত বেশিক্ষণ মলের ভেতরে থাকবেন, তাঁদের লাভের অঙ্ক ততটাই স্ফীত হবে। আধুনিক বাজার অর্থনীতিতে এই ‘টাইমলেসনেস’ বা সময়হীনতাই হলো মুনাফা অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার।