ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরনবিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা বড় কোনও বিজনেস স্কুল থেকে MBA, কিংবা দেশের তাবড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক হওয়ার মতো ট্র্যাডিশনাল কেরিয়ার পথ কি এখনও প্রাসঙ্গিক? প্রশ্নটা উঠছে, যখন ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার মত, ট্র্যাডিশনাল পড়াশোনার যুগ শেষের পথে। তিনি স্পষ্ট জানাচ্ছেন, যেভাবে অর্থনৈতিক পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে ভাল ডিগ্রি থাকলেই চাকরি হবে, এই গ্যারান্টি নেই।
সংবাদ সংস্থা ANI-কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরণ জানালেন, বহু ছাত্রছাত্রী এখনও শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি সরলরৈখিক পথ অনুসরণ করে চলেছে, স্নাতক হওয়ার পর উচ্চশিক্ষা বা UPSC-এর মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ঝুঁকছে। কিন্তু তারা খুব কমই ভেবে দেখছে, সেই ডিগ্রি বা যোগ্যতা আদৌ ভবিষ্যতে টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে কি না।
MBA, কম্পিউটার সায়েন্স ডিগ্রির যুগ শেষ
নিজের সন্তান ও বন্ধুবান্ধবের সন্তানদেরও তিনি একই পরামর্শ দেন বলে জানালেন নাগেশ্বরণ। প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা (CEA) বলেন, 'ভারতে দীর্ঘদিন ধরেই ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং, কাঠমিস্ত্রির কাজ বা ইলেকট্রিক্যাল কাজের মতো বৃত্তিমূলক পেশাগুলিকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, সুইত্জারল্যান্ড, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চিনের মতো দেশগুলিতে কারিগরি দক্ষতা ও ট্রেড-ভিত্তিক পেশাগুলিকে অনেক বেশি সম্মান ও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্বায়নের জন্য সফটওয়্যার, কম্পিউটার সায়েন্স বা MBA ডিগ্রি কিছুকাল অ্যাডভান্টেজ দিয়েছিল, কিন্তু সেই যুগ শেষ। এখন ভবিষ্যত্ হবে ব্যবসার স্কিল, সফট স্কিল সহ সেই ধরনের পেশা,যেখানে মানুষের চিন্তাশক্তি ও উপস্থিতি জরুরি।'
কোন ধরনের পেশা ভবিষ্যত্?
এই বক্তব্যের সমর্থনে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন নাগেশ্বরন। তিনি জানান, এক তরুণ শেফের (রন্ধনশিল্পী) সঙ্গে তাঁর কথা হচ্ছিল, যিনি নিজের বন্ধুদের অন্যান্য পেশায় সাফল্য দেখে নিজেকে পিছিয়ে পড়া মনে করছিলেন। তখন নাগেশ্বরন তাঁকে পরামর্শ দেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পোস্ট দেখে নিজের অগ্রগতি বিচার করা উচিত নয়। তিনি ওই তরুণকে বলেন, রান্নার মতো একটি দক্ষতা তিনি অর্জন করেছেন, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা প্রযুক্তি খুব সহজে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। নাগেশ্বরনের কথায়, 'তুমি এমন একটি দক্ষতা শিখেছ, যা প্রযুক্তির পক্ষে সহজে নকল বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।'
তিনি আরও বলেন, আগামী দিনে কাউন্সেলিং, কেয়ারগিভিং, হসপিটালিটি এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নির্ভর পেশাগুলির গুরুত্ব আরও বাড়বে। কারণ এই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে মানবিক সংবেদনশীলতা, সহমর্মিতা এবং ব্যক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হয়, যা প্রযুক্তির পক্ষে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করা কঠিন।
শরীরই সম্পদ, পরামর্শ নাগেশ্বরনের
নাগেশ্বরনের তাঁর মতে, সাধারণত আলোচনা হয় ভারত ধনী হওয়ার আগেই বৃদ্ধ হয়ে যাবে কি না, কিন্তু আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হল, দেশ সমৃদ্ধ হওয়ার আগেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন কি না। তিনি ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভে-র তথ্যের উল্লেখ করে বলেন, বিভিন্ন স্বাস্থ্য সূচকে উন্নতি হলেও প্রায় সব আয়স্তরেই স্থূলতা বা ওবেসিটির হার বেড়েছে। তাঁর মতে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং রাত করে খাবার খাওয়ার প্রবণতা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
নাগেশ্বরনের বক্তব্য, কোনও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু প্রযুক্তি, পরিকাঠামো বা বিনিয়োগের উপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন সুস্থ, কর্মক্ষম এবং উৎপাদনশীল নাগরিক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং আয় বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।