কখনো ভেবে দেখেছেন কেন পুরনো রেলের টিকিটের পাশে ছোট ছোট ছিদ্র থাকতো?ডিজিটাল টিকিট এবং মোবাইল অ্যাপের যুগের আগে যদি আপনি ট্রেনে ভ্রমণ করে থাকেন, তাহলে সম্ভবত আপনার রেলের পুরনো টিকিটের কথা মনে থাকবে। একটি ছোট কাগজের টুকরোতে ট্রেনের তথ্য, স্টেশনের নাম এবং ভাড়া ছাপা থাকত। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, টিকিটের দুই পাশে থাকা ছোট ছোট ছিদ্রগুলো। সেই সময়ে, বেশিরভাগ মানুষ ভাবতেন যে এই ছিদ্রগুলো কেবল নকশা বা সজ্জার জন্য, কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে একটি বিশেষ প্রযুক্তি কাজ করত।
ভারতীয় রেল প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টিকিট ছাপত, এবং তখনকার দিনে মুদ্রণ আজকের মতো এত সহজ ছিল না। কম্পিউটার এবং আধুনিক প্রিন্টারগুলো ততটা উন্নত ছিল না, তাই টিকিট ছাপানোর জন্য বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। এই যন্ত্রগুলোর কারণেই টিকিটে এই ছোট ছোট ছিদ্রগুলোর প্রয়োজন হয়েছিল।
টিকিটের কিনারের এই ছোট ছিদ্রগুলো প্রযুক্তিগতভাবে 'স্প্রকেট হোল' (Sprocket Holes) নামে পরিচিত ছিল। এগুলো বিশেষভাবে ভারতীয় রেলের বহু বছর ধরে ব্যবহৃত ডট-ম্যাট্রিক্স প্রিন্টারের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। সেই সময় টিকিট আলাদা আলাদা পাতায় নয়, বরং একটি লম্বা, অবিচ্ছিন্ন কাগজের শিটে ছাপা হতো। প্রিন্টার যাতে টিকিটগুলোকে নির্ভুলভাবে ধরতে ও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সেজন্য এই কাগজের দুই পাশে সমান দূরত্বে ছিদ্র করা হতো।
প্রিন্টারের ভেতর দিয়ে কাগজের সঠিক চলাচল নিশ্চিত করা
পুরনো ডট-ম্যাট্রিক্স প্রিন্টারগুলো সম্পূর্ণরূপে একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করত । এগুলোতে ছোট ছোট দাঁতযুক্ত চাকা লাগানো থাকত, যা কাগজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাগজের কিনারের ছিদ্রগুলোতে আটকে যেত। এই ছিদ্রগুলো না থাকলে কাগজ প্রায়শই পিছলে যেত বা বেঁকে যেত, যার ফলে টিকিটের তথ্য ভুলভাবে ছাপা হতো। কিন্তু স্প্রকেট হোলগুলো কাগজকে সোজা পথে চলতে সাহায্য করত, যার ফলে প্রতিটি টিকিট নির্ভুলভাবে ছাপা হতো। রেলের টিকিটে ট্রেনের নম্বর, স্টেশনের নাম, ভাড়া, তারিখ এবং সময়ের মতো জরুরি তথ্য থাকত। সামান্যতম মুদ্রণ ত্রুটিও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারত। স্প্রকেট হোলগুলো নিশ্চিত করত যে কাগজ প্রতিবার একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলবে, যার ফলে নির্ভুল মুদ্রণ সম্ভব হতো। এই কারণেই লক্ষ লক্ষ টিকিট ছাপার পরেও সেই সময়ে এই মুদ্রণ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হতো।
প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ছিদ্রগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেলের টিকিট প্রযুক্তিও পরিবর্তিত হয়েছে। ধীরে ধীরে ডট-ম্যাট্রিক্স প্রিন্টারের পরিবর্তে আধুনিক থার্মাল এবং ডিজিটাল প্রিন্টার ব্যবহৃত হতে শুরু করে। নতুন প্রিন্টারগুলোতে কাগজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্প্রকেট সিস্টেমের প্রয়োজন হতো না। ফলস্বরূপ, ক্রমাগত চলমান কাগজের ব্যবহারও কমে যায় এবং টিকিটের কিনারে দৃশ্যমান ছোট ছিদ্রগুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। আজ, মোবাইল টিকিট এবং ই-টিকিটের যুগেও, রেলের পুরনো টিকিট অনেকের স্মৃতির অংশ হয়ে আছে। সেই টিকিটগুলোর কিনারের ছোট ছিদ্রগুলো শুধু একটি নকশা ছিল না, বরং তৎকালীন একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার অংশ ছিল। সম্ভবত এ কারণেই, আজও পুরনো টিকিটের দিকে তাকালে মানুষের রেলযাত্রার সেই সোনালী দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, যখন হাতে টিকিট ধরে রাখাটা ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।