হিমন্ত বিশ্বশর্মা।-ফাইল ছবি২০২৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচনের ফল যেন একেবারে স্পষ্ট করে দিল, হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এখন উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ। টানা তিনবার অসমে বিজেপির জয় শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরই চমকে দেয়নি, বরং এক নতুন রাজনৈতিক কৌশলের দৃষ্টান্তও তৈরি করেছে। এই জয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বেশি শোনা গেছে দুটি শব্দ, ‘মামা’ এবং ‘মিয়াঁ’।
একদিকে ‘মামা’, আবেগ, সম্পর্ক আর ভরসার প্রতীক। অন্যদিকে ‘মিয়াঁ’, পরিচয় ও মেরুকরণের রাজনীতি। এই দুইয়ের মিশ্রণেই তৈরি হয়েছে বিজেপির জয়ের শক্ত ভিত।
‘মামা’: আবেগের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ
অসমে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা শুধু মুখ্যমন্ত্রী নন, তিনি বহু মানুষের কাছে ‘মামা’। এই সম্বোধন নিছক একটি ডাক নয়, বরং একটি রাজনৈতিক কৌশল, যা সাধারণ মানুষের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের অনুভূতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে এই ‘মামা’ ইমেজ ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
‘অরুণোদয় ২.০’-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি মহিলাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারের সুবিধা যে সরাসরি ঘরে পৌঁছাচ্ছে, সেই বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ পরিবারের মহিলারা এই সাহায্যকে বাস্তব সহায়তা হিসেবে দেখেছেন।
নির্বাচনের আগে এই প্রকল্পগুলির বিস্তার আরও বাড়ানো হয়, যা ভোটের ময়দানে বড় ভূমিকা নেয়। মহিলাদের এক বড় অংশ এই ‘মামা’-র উপর আস্থা রেখে বিজেপির পক্ষে ভোট দেন।
‘মিয়াঁ’: পরিচয়ের রাজনীতি ও মেরুকরণ
অন্যদিকে ‘মিয়াঁ’ শব্দটি ব্যবহার করে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা একেবারে ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন। অসমে দীর্ঘদিন ধরেই অনুপ্রবেশ ও জনসংখ্যার প্রশ্ন একটি সংবেদনশীল বিষয়। এই ইস্যুকে সামনে রেখে তিনি নিজেকে কঠোর ও আপসহীন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
জনসভায় তিনি বারবার ‘মিয়াঁ রাজনীতি’-কে নিশানা করেছেন এবং একে অসমীয়া সংস্কৃতি ও ভূমির জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করেছেন। মাদ্রাসা বন্ধ করা, ভূমি সংক্রান্ত কড়া অবস্থান, এই সব পদক্ষেপ তাঁর এই ভাবমূর্তিকে আরও জোরদার করেছে।
এই কৌশলে হিন্দু ও আদিবাসী ভোটারদের বড় অংশ বিজেপির দিকে একত্রিত হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীদের ‘সংখ্যালঘু তোষণ’-এর অভিযোগ তুলে বিজেপি রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করেছে।
উন্নয়নের ছোঁয়া: শুধু আবেগ নয়, কাজের প্রমাণ
শুধু আবেগ বা মেরুকরণ নয়, উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন হিমন্ত। নতুন সড়ক, মেডিকেল কলেজ, এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, এই সবই তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাঁর কাজের ধরনও আলাদা, হঠাৎ রাতের পরিদর্শন, সরাসরি নজরদারি, এসব মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থা তৈরি করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে হয়েছে, সরকার শুধু কথা বলছে না, কাজও করছে।
কংগ্রেসের দুর্বলতা
এই নির্বাচনে কংগ্রেসের ব্যর্থতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। দলের প্রধান মুখ গৌরব গগৈ মাঠে সেইভাবে প্রভাব ফেলতে পারেননি। দিল্লিমুখী রাজনীতি ও সীমিত জনসংযোগ তাঁকে পিছিয়ে দিয়েছে।
এছাড়া কৌশলগত ভুল, বিশেষ করে জোট না করা, সংখ্যালঘু ভোটকে বিভক্ত করেছে। বিজেপি সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বড় জয় পেয়েছে।