
ভারতে বাম রাজনীতির পরিস্থিতিজাতীয় রাজনীতিতে বামেদের অস্তিত্ব রীতিমতো সঙ্কটজনক। একদা ভূমি সংস্কার, কৃষক, শ্রমিকের অধিকারের আওয়াজ তুলে, আন্দোলন করে দেশের রাজনীতিতে যে ছাপ রেখেছিল বামদলগুলি, সেই বামফ্রন্ট অনেক দিন ধরেই ক্ষয়ীষ্ণু। অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে লড়ে যাচ্ছে।
বামেদের নিয়ে হঠাত্ এই প্রতিবেদনের মূল কারণ হল কেরল। বামেদের শেষ দুর্গ। একমাত্র রাজ্য যেখানে সরকারে বামেরা। যদিও এগজিট পোল রেজাল্ট বলছে, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট এবার ক্ষমতায় আসতে চলেছে কেরলে। সিপিএম-এর নেতৃত্বে LDF (Left Democratic Front) হারছে। এগজিট পোলের রেজাল্টের উপর ভরসা করা যায় না। কারণ, অনেক সময় ভুলও প্রমাণিত হয়েছে অতীতে। কিন্তু যদি ৪ মে এগজিট পোলের রেজাল্ট ঠিক প্রমাণিত হয়, তাহলে ভারতে কোনও রাজ্যেই আর বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকবে না। অর্থাত্ দেশ বাম শূন্য। দীর্ঘ কয়েক দশকে এই প্রথমবার হবে।
১৯৮৭ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে CPM-এর নেতৃত্বাধীন বামেরা বিধানসভায় সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছিল। কেরল, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে একযোগে বাম সরকার ছিল। লোকসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০০৪ সালে সবচেয়ে ভাল ফল করেছিল বামেরা। ৬০টি আসন জিতেছিল।
কেন কেরল 'শিবরাত্রির সলতে'?
গোটা দেশে যদি বাম প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে চর্চা হয়, তাহলে একমাত্র কেরলের নামই উঠে আসবে। কেরলে বামেদের ইতিহাস ঐতিহ্যশালী। ১৯৫৭ সালে বিশ্বের প্রথম বাম সরকার গঠিত হয়েছিল কেরলে ইএমএস নাম্বুদিরিপাদের নেতৃত্বে। সেই বামেদের শেষ দুর্গেও পতন ঘটার সম্ভাবনা ৪ মে। পাঁচটি এগজিট পোল রেজাল্ট বলছে, ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (UDF) হারতে চলেছে। নিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন কেরলে বাম সরকারের পতন হবে ১০ বছর পর। যদিও কেরলবাসী এলডিএফ ও ইউডিএফ-কে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ক্ষমতায় আনে।

ভারতের কোন অঞ্চলে বামেদের অস্তিত্ব রয়েছে?
সিপিএম-এর আইনসভায় শক্তি এখন মূলত কেরলকেন্দ্রিক। অন্যদিকে সিপিআই এবং সিপিআইএম(এল)এর দখলে সংসদ ও বিধানসভায় হাতে গোনা কয়েকটি আসনই রয়েছে। এক সময় ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেওয়া কমিউনিস্ট দলগুলি এখন জাতীয় ভোটের খুবই ছোট অংশ জুড়ে রয়েছে। বামপন্থী দলগুলির এই পতনের পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরার মতো রাজ্যে তৈরি হয় তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা। শিল্পায়নসহ অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ মানুষের সমর্থন কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি, আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান এবং বিজেপির বিস্তারে বামেদের ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাঙ্কে চাপ পড়েছে। অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও মতাদর্শগত কঠোরতাও তাদের অভিযোজন ক্ষমতাকে দুর্বল করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকর্ষণ করতেও বামেরা ব্যর্থ হয়েছে।
টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প
তবে নির্বাচনী ধাক্কা সত্ত্বেও বামপন্থীরা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সংগঠন এবং শ্রমিক অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও কল্যাণমূলক নীতির মতো ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে এখনও তাদের প্রভাব রয়েছে। শাসনক্ষমতা থেকে সরে এসে এখন তাদের জোর মূলত তৃণমূল স্তরের সংগঠন ও জোট রাজনীতিতে। ফলে প্রশ্নটা আর বামেদের অস্তিত্ব আছে কি না, তা নয়, বরং কোথায় এবং কীভাবে তারা রয়েছে। ২০২৬ সালে এর উত্তর খুঁজতে হলে নজর দিতে হবে কেরলের ক্ষমতার করিডরে, বিহারের কিছু গ্রামীণ অঞ্চলে, বাংলা ও ত্রিপুরার অবশিষ্ট ঘাঁটিতে এবং দেশজুড়ে সংগঠিত আন্দোলনের নেটওয়ার্কে। ভারতের বাম রাজনীতির গল্প এখন আর প্রাধান্যের নয়, বরং টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প।