
Priyaranjan Dasmunsi Empire: রায়গঞ্জ মানেই এক সময় ছিল ‘প্রিয়দা’র দুর্গ। উত্তর দিনাজপুরের এই জনপদে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির নাম আজও মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে। মালদহে গণি খান চৌধুরী যেমন এক মিথ, রায়গঞ্জে প্রিয়রঞ্জনও ছিলেন তেমনই এক অপরাজেয় শক্তি। কিন্তু সময়ের প্রলেপে সেই আবেগের ভাঁড়ারে এখন টান পড়েছে। প্রিয়রঞ্জন কোমায় যাওয়ার পর স্ত্রী দীপা দাশমুন্সি সেই আবেগের পালে হাওয়া লাগিয়ে কিছুদিন আধিপত্য ধরে রাখলেও, আজ রায়গঞ্জের রাজনৈতিক মানচিত্রে কংগ্রেসের সূর্য প্রায় অস্তাচলে।
কুলিক নদীর পাড়ে আজও প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির নাম নিলে প্রবীণদের চোখ ছলছল করে আসে। বাম আমলে ক্ষমতায় আসবে না জেনেও প্রিয়র প্রিয় দল কংগ্রেসকে বিমুখ করেনি রায়গঞ্জ তথা উত্তর দিনাজপুর। কিন্তু সেই ইভিএমে ভোট পড়ছে কি? পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। যে রায়গঞ্জ একসময় প্রিয়রঞ্জনের ‘সাম্রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে আজ কংগ্রেসের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৮ সালে প্রিয়রঞ্জন অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী দীপা দাশমুন্সি ২০০৯-এর লোকসভায় বড় জয় পেলেও, পরবর্তী এক দশকে ছবিটা দ্রুত বদলে গিয়েছে।
২০০৯ সাল
প্রিয়রঞ্জনের অসুস্থতার পর দীপা দাশমুন্সি যখন ভোটে দাঁড়ান, রায়গঞ্জের মানুষ দু-হাত উজাড় করে আশীর্বাদ করেছিলেন। কংগ্রেস একাই পেয়েছিল প্রায় ৫০% ভোট। বামফ্রন্টকে বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে জয়ী হয় হাত শিবির। ২০১৪ সালে পতনের শুরু। এই সময়েই কংগ্রেসের দুর্গে প্রথম বড় ফাটল ধরে। দলের ভোট ব্যাংক ৫০% থেকে কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৮.৫০%-এ। বামপ্রার্থী মহম্মদ সেলিমের কাছে সামান্য ব্যবধানে হেরে দ্বিতীয় স্থানে নেমে আসে কংগ্রেস। ২০১৯ সাল ভরাডুবি হয়। এটি ছিল কংগ্রেসের জন্য সবথেকে বিপর্যয়কর বছর। মোদী ঝড়ে এবং মেরুকরণের রাজনীতিতে কংগ্রেসের ভোট তলানিতে গিয়ে ঠেকে। মাত্র ৬.৬% ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থানে চলে যায় দল। রায়গঞ্জ দখল করে বিজেপি। ২০২৪ সাল (জোটের লড়াই): বামেদের সঙ্গে জোট বেঁধে কংগ্রেস কিছুটা লড়াইয়ে ফেরার চেষ্টা করে। ভোট বেড়ে ১৯% হলেও তা জেতার জন্য যথেষ্ট ছিল না। বিজেপি নিজের আধিপত্য বজায় রাখে আর কংগ্রেস তৃতীয় স্থানেই থমকে যায়।
যেখানে একসময় রায়গঞ্জ মানেই ছিল কংগ্রেস, সেখানে আজ লড়াইটা মূলত বিজেপি বনাম তৃণমূলের। গত ১৫ বছরে কংগ্রেসের ভোট ব্যাংক ৫০% থেকে কমে ১৯%-এ নেমে আসা প্রমাণ করে যে, প্রিয়রঞ্জনের সেই পুরনো ‘ইমেজ’ বা আবেগ দিয়ে এখন আর ভোটের বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে না পারাই কংগ্রেসের এই করুণ দশার মূল কারণ।
কেন এই বিপর্যয়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি রায়গঞ্জকে যে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন (যেমন এইমস-এর ধাঁচে হাসপাতাল বা রেলের সংযোগ), তা সম্পূর্ণ না হওয়া এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে সঠিক নেতৃত্বের অভাবই কংগ্রেসকে জনবিচ্ছিন্ন করেছে। একসময় যারা কট্টর কংগ্রেসি ছিলেন, তাঁরা এখন হয় তৃণমূলের ‘উন্নয়ন’ নয়তো বিজেপির ‘হিন্দুত্ব’ ও কেন্দ্রীয় নীতির দিকে ঝুঁকেছেন।
২০২১-এর বিধানসভা এবং ২০২৪-এর লোকসভা ও উপ-নির্বাচনের ফলাফল বলছে, লড়াই এখন দ্বিমুখী। একদিকে বিজেপির কার্তিক পাল, অন্যদিকে তৃণমূলের কৃষ্ণ কল্যাণী। প্রিয়রঞ্জনের আবেগ আজও মানুষের মনে থাকলেও, ভোটযন্ত্রে সেই ‘প্রিয়-মিথ’ আজ ধূসর অতীত।