রাহুল গান্ধীতে ভর করে কংগ্রেসের লক্ষ্য বাংলায় ফের পতাকা ওড়ানোRahul Gandhi Congress: ১৪ এপ্রিল, মোদী-মমতা-শাহর পর এবার রাহুল গান্ধী। মঙ্গলবার উত্তরবঙ্গে প্রচারের ষোলকলা পূর্ণ করে দিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায় দাঁড়িয়ে আজ তিনি যে ভাষায় তৃণমূল আর বিজেপিকে আক্রমণ করলেন, তাতে স্পষ্ট, কংগ্রেস এবার আর শুধু জোটের অঙ্কে আটকে থাকতে রাজি নয়। দীর্ঘ টালবাহানার পর বামেদের হাত ছেড়ে একলা চলো নীতি নিয়েছে কংগ্রেস। আর সেই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রাহুলের প্রধান টার্গেট এখন বাংলার উত্তরভাগ এবং মালদহ-মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক।
তৃণমূল অবশ্য কংগ্রেসকে ‘ভোটকাটুয়া’র তকমা দিয়ে নস্যাৎ করতে চাইছে। কুণাল ঘোষদের সাফ কথা, “বিজেপিকে রুখতে মমতাই যথেষ্ট, কংগ্রেস এখানে এসে আসলে গেরুয়া শিবিরকেই অক্সিজেন দিচ্ছে।” তবে কংগ্রেসের অন্দরমহল বলছে অন্য কথা। তাঁদের বাজি এখন আদি বনাম নবীন কংগ্রেসের রসায়ন। বিশেষ করে মালদহ মালতীপুরে মৌসম বেনজির নূরের ঘরওয়াপসি বা সুজাপুরে আব্দুল মান্নানের মতো পোড়খাওয়া নেতাদের লড়াই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ২৯৪ আসনেই এবার সমানে সমানে টক্কর দিতে চায় হাত শিবির।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া লড়াই শুরু করেছে জাতীয় কংগ্রেস। দীর্ঘ টালবাহানার পর বামেদের হাত ছেড়ে এবার ২৯৪টি আসনেই একা লড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে শতাব্দী প্রাচীন দলটি।মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কংগ্রেসের পুরনো দুর্গ ফিরে পাওয়াই এখন প্রদেশ নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে বহরমপুর, সুজাপুর এবং মালতীপুরের মতো আসনগুলোতে জয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী ঘাসফুল শিবির থেকে ফিরে আসা বা আদি কংগ্রেসের নেতারা।
মুর্শিদাবাদ বরাবরই কংগ্রেসের গড় হিসেবে পরিচিত। রাহুল গান্ধীর প্রথম দফার হাইভোল্টেজ প্রচারের তালিকায় রয়েছে এই জেলাও। সামশেরগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া এই সফরে রাহুলের লক্ষ্য মূলত সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক পুনরুদ্ধার করা। প্রদেশ কংগ্রেসের অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, অধীর চৌধুরীর খাসতালুক বহরমপুরে এবার প্রেস্টিজ ফাইট। গত লোকসভা নির্বাচনে ধাক্কা খেলেও বিধানসভা ভোটে অধীর অনুগামীরা বুক ঠুকে লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছেন। রাহুলের পর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সফরও চূড়ান্ত হতে চলেছে, যা উত্তরবঙ্গের চা-বলয় এবং মালদার ভোটারদের মনে বাড়তি উৎসাহ জোগাবে বলে মনে করছে দল।
মালদা জেলায় এবার বিশেষ নজর কেড়েছেন মৌসম বেনজির নূর। তৃণমূল ছেড়ে ফের ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসার মতো করেই কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন তিনি। মালতীপুর আসন থেকে তাঁর লড়াই জেলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি সুজাপুরে আব্দুল মান্নান বা ডামডামে সুস্মিতা বিশ্বাসদের মতো প্রার্থীদের লড়িয়ে দিয়ে কংগ্রেস প্রমাণ করতে চাইছে যে, তারা স্রেফ সাইনবোর্ড হয়ে থাকতে রাজি নয়। উত্তর দিনাজপুর এবং মালদহের মুসলিম প্রধান গ্রামগুলোতে কংগ্রেসের পুরনো ভোটব্যাঙ্ক যদি তৃণমূলের থেকে সরে আসে, তবে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি আসনে জয়ের মুখ দেখলেও দেখতে পারে হাত শিবির।
বাংলার এই বহুমুখী লড়াইয়ে কংগ্রেসের ইস্তাহারেও দেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ চমক। ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্য মাসে ২০০০ টাকা সহায়তা এবং পরিবারের জন্য ১০ লক্ষ টাকার বিমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মল্লিকার্জুন খাড়্গে। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ মিলিয়ে কংগ্রেসকে চারটি জোনে ভাগ করে প্রচার চালানোর যে ব্লু-প্রিন্ট দিল্লি তৈরি করেছে, তার ফল ৩রা মে ইভিএম খুললেই স্পষ্ট হবে।
২০২১-এর ভোটে কংগ্রেসের ঝুলি ছিল শূন্য। কিন্তু ২০১৬-র স্মৃতি উসকে দিলে দেখা যাবে, মুর্শিদাবাদ বা মালদহে কংগ্রেসের দাপট কেমন ছিল।
মুর্শিদাবাদ: জেলার ২২টি আসনের মধ্যে ২০১৬ সালে একাই ১৪টি জিতেছিল কংগ্রেস। ২০২১-এ সেই দুর্গ ধুলিসাৎ হয়ে যায়। এবার রাহুল গান্ধী সামশেরগঞ্জ থেকে যে প্রচার শুরু করেছেন, তাতে অন্তত ৭-৮টি আসন পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছে বহরমপুর।
মালদহ: গতবার সুজাপুর বা মানিকচকের মতো গড় হাতছাড়া হলেও এবার মৌসম নূর আসরে নামায় হিসেব পাল্টাতে পারে। কংগ্রেসের ব্লু-প্রিন্ট বলছে, সংখ্যালঘু প্রধান ১০-১৫টি আসন যদি তারা ঝোলায় পুরতে পারে, তবে কিং-মেকারের ভূমিকা নিতেও তারা পিছপা হবে না।
উত্তর দিনাজপুর: চোপড়া, ইসলামপুর বা গোয়ালপোখরের মতো এলাকায় রাহুলের আজকের সফর কতটা দাগ কাটল, তা বোঝা যাবে ইভিএমে। তবে অধীর-অনুগামীদের দাবি, "এবার আর সাইনবোর্ড নয়, বিধানসভায় দাপুটে ফেরাই লক্ষ্য।"