শান্তিতে ভোট শীতলকুচি-চোপড়ায় (ফাইল ছবি)West Bengal Assembly Election 2026: শীতলখুচি আর চোপড়া, উত্তরবঙ্গের মানচিত্রে এই দুই নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বারুদের ধোঁয়া আর রক্তাক্ত জনপদের ছবি। ভোট এলেই যেখানে নিয়তি হয়ে দাঁড়ায় গুলি আর বোমাবাজি, ২০২৬-এর নির্বাচনে সেখানে ধরা পড়ল এক অবিশ্বাস্য ছবি। প্রাণহানি তো দূরস্থান, বড়সড় কোনও গোলমালের খবরও মেলেনি। উত্তরবঙ্গের এই শান্ত সমাহিত মেজাজ দেখে রাজনৈতিক মহল যেমন থমকে গিয়েছে, তেমনই অবাক সাধারণ ভোটাররাও।
বিজেপি শিবিরের দাবি, এবার কমিশন কোমর বেঁধে নামাতেই এই অসাধ্য সাধন হয়েছে। বিজেপি নেতা মনোজ টিগগার সাফ কথা, “কমিশন এবার ভয়ের পরিবেশ দূর করতে পেরেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী যেভাবে কাজ করেছে, তাতে দুষ্কৃতীরা বেচাল হওয়ার সাহস পায়নি। আসলে জয় হয়েছে গণতন্ত্রেরই।”
উল্টো সুর ঘাসফুল শিবিরে। বিদায়ী মন্ত্রী উদয়ন গুহ অবশ্য এর পেছনে অন্য অঙ্ক দেখছেন। তাঁর মতে, ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়ায় ভোটের হার বেশি মনে হচ্ছে। তবে মানুষ শান্তিতে ভোট দেওয়ায় খুশি তিনিও। উদয়নবাবুর আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা, “মানুষ নিজেদের ভোট নিজেরাই দিয়েছে, উত্তরবঙ্গে এবার তৃণমূল আগের চেয়েও ভালো ফল করবে।”
শীতলখুচির আমতলিতে ১২৬ নম্বর বুথটি আজও বহন করছে ২০২১-এর সেই ক্ষত। সেবার কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চার গ্রামবাসীর মৃত্যু এবং দুষ্কৃতীদের গুলিতে প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণ আনন্দ বর্মনের মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে। এদিন সেই বিষাদ নিয়েই ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন নিহত মনিরুজ্জামানের ভাই পিছু রহমান। ব্যালটে আঙুলের ছাপ দিলেও মনের মধ্যে পুষে রাখা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বললেন, “যারা গিয়েছে তারা তো আর ফিরবে না। বিচারও পাইনি। তবে নাগরিক হিসেবে কর্তব্যটুকু করে গেলাম।”
একই ‘মিরাকল’ দেখা গেল উত্তর দিনাজপুরের চোপড়াতেও। যেখানে ভোট মানেই ছিল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, সেখানে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই চোখে পড়ল উৎসবের আমেজ। কোনও চোখরাঙানি নেই, লাঠি-বাঁশ নিয়ে মহড়া নেইশান্তিতে। বুথের লাইনে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ থেকে তরুণ। চায়ের দোকানে বসে স্থানীয় বাসিন্দারা স্মৃতিচারণ করছিলেন পুরনো দিনগুলোর। তাঁদের আক্ষেপ, “ভোট যদি এমনই শান্তিতে হতো, তবে অতগুলো প্রাণ অকালে ঝরত না।”
তৃণমূল প্রার্থী হামিদুল রহমানের দাবি, চোপড়া চিরকালই শান্ত, বিরোধীদের চক্রান্তে বদনাম ছড়ানো হয়। অন্যদিকে বিজেপি নেতা সুরজিৎ সেনের পাল্টা দাবি, তৃণমূল অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করলেও কমিশনের তৎপরতায় তা ধোপে টেকেনি। হার-জিত যাই হোক, উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই হিংসামুক্ত ভোট যে এক বড় মাইলফলক হয়ে থাকল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।