
Srikhola Highest Election Booth West Bengal: এই রাজ্যের সবচেয়ে উঁচু ভোটগ্রহণ কেন্দ্র যেখানে খচ্চরের পিঠে চড়ে পৌঁছতে হয়, চেনেন?Srikhola Highest Election Booth West Bengal: উচ্চতা সমুদৃপষ্ঠ থেকে উচ্চতা প্রায় ১০ হাজার ফুট। চারদিকে কুয়াশার চাদর আর খাড়াই পাহাড়। এই মেঘের মুলুকেও পৌঁছে যাচ্ছে গণতন্ত্রের লড়াই। রাজ্যের উচ্চতম এবং দুর্গমতম ভোটগ্রহণ কেন্দ্র দার্জিলিংয়ের ‘শ্রীখোলা’ এখন ভোটের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। সেখানে যাওয়ার নেই কোনও রাস্তা, নেই চাকা গড়ানোর উপায়। পিঠে লটবহর নিয়ে আর খচ্চরের ওপর ইভিএম চাপিয়ে সেখানে পৌঁছতে হয় ভোট নিতে। কঠিন কাজ, বিশেষ করে বাইরের সরকারি কর্মী, যাঁদের এমন রাস্তায় চলার অভ্যাস নেই, প্রায় এভারেস্ট চড়ার মতোই কঠিন লক্ষ্য। তবু পাহাড়ের প্রান্তিক মানুষটির ভোটাধিকার নিশ্চিত করার তাগিদে পৌঁছতেই হয়।
শ্রীখোলা মানেই এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আজও সেখানে পৌঁছয়নি মোবাইল টাওয়ার, নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। সোলার সিস্টেমের ক্ষীণ আলোই সেখানে ভরসা। ফলে ক্যামেরা বা মোবাইল চার্জ দেওয়ার কথা ভাবাই বিলাসিতা। দুর্গমতার কারণে একটা উচ্চতার পর খচ্চরই একমাত্র সঙ্গী। তবে পাহাড়ের ওই পাথুরে পথে আনকোরা ভোটকর্মীরা খচ্চরে চড়ার সাহস পান না। নিজের দুই পায়ের ওপর ভরসা করেই ১০-১৫ কিলোমিটার চড়াই পথ ভাঙতে হয় তাঁদের।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই জনপদটি ভোটের মানচিত্রে ঢুকেছে মাত্র এক দশক আগে। ২০১৪ সালের আগে শ্রীখোলার মানুষের কাছে নির্বাচন ছিল রূপকথার মতো। ১০ কিলোমিটার পাহাড় ভেঙে ভোট দিতে যাওয়ার অনীহায় নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকতেন তাঁরা। আজ পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিক প্রচারের উত্তাপ সেখানে পৌঁছয় না বললেই চলে। নেতারা সচরাচর এই রুক্ষ পথে হাঁটা দেন না।

এলাকায় ভোটার সংখ্যা কম হলেও উন্মাদনা তুঙ্গে। এর আগে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী অমর সিং রাই যখন অসাধ্য সাধন করে এই দেড় হাজারি গ্রামে পৌঁছেছিলেন, তখন গোটা গ্রাম ভেঙে পড়েছিল। যাত্রাপালা দেখার মতো আগ্রহ নিয়ে মানুষ দেখেছিলেন সেই নির্বাচনী সভা। নেতাদের দেখা পাওয়া যেখানে বিরল ঘটনা, সেখানে ইভিএম নিয়ে ভোটকর্মীদের পৌঁছনো তাঁদের কাছে পরম প্রাপ্তি।
শ্রীখোলা একা নয়, দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে দারাগাঁও এবং রাম্মামের মতো আরও অন্তত ১৫টি বুথে ভোট নেওয়া কমিশনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। যানবাহন সেখানে স্রেফ ডিকশনারির শব্দ। ৫ থেকে ১৫ কিলোমিটার পাহাড় ডিঙিয়েই পৌঁছতে হয় গন্তব্যে। ঘোড়া কিংবা খচ্চরের পিঠে ভোট সামগ্রী চাপিয়ে সরকারি কর্মীদের এই লড়াই কার্যত এক অনন্য পরীক্ষা।
রাতে সামান্য পাওয়ারের আলো আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যেই চলবে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি। পরদিন সকালে লাইনে দাঁড়াবেন পাহাড়ের মানুষ। কোনও প্রচার নেই, নেই দেওয়াল লিখন বা মাইকের চিৎকার। শুধু আছে অধিকার রক্ষার জেদ। আর সেই জেদকে সম্মান জানাতেই দুর্গম পাহাড়ে নিজেদের জীবন বাজি রেখে পৌঁছে যাচ্ছেন এই ‘সরকারি পরীক্ষক’রা।
আসলে শ্রীখোলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রের শেকড় কত গভীরে। খচ্চরের পিঠে দুলতে দুলতে যখন ইভিএম মেশিনটা খাড়াই পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠে, তখন বোঝা যায় এক-একটি ভোটের মূল্য ঠিক কতখানি। আধুনিক প্রযুক্তির জমানাতেও পাহাড়ের এই অংশটি আজও পড়ে আছে আদিম আর অকৃত্রিম মেজাজে, যেখানে পরিশ্রমই শেষ কথা বলে।