

বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে। ফলে তাদের বাদ দিয়েই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটি ঐতিহাসিক জোড়া নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। প্রথমটি হলো পরবর্তী ক্ষমতাসীন দল নির্ধারণের জন্য ১৩তম সংসদ নির্বাচন, আর দ্বিতীয়টি—'জুলাই সনদ' নামে পরিচিত একটি সাংবিধানিক গণভোট, যা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সংবিধানে বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন আনা হবে কি না।
মূলত বিএনপি বনাম জামাত-এনসিপি জোটের এই দ্বিমুখী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-জুড়ে প্রস্তুতি তুঙ্গে। ভোটের প্রায় এক সপ্তাহ বাকি থাকতে গত ৪ ফেব্রুয়ারি জামাত তাদের নির্বাচনী ইস্তেহার প্রকাশ করেছে। সাধারণ ইস্তেহারের মতোই এতে বাংলাদেশের জন্য একটি সাম্যবাদী এবং আদর্শ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যায় যে, এই ৯০ পাতার ইস্তেহারে ব্যবহার হওয়া অন্তত আটটি ছবি ভারত থেকে নেওয়া হয়েছে। ভারতবিরোধী অবস্থানের জন্য খ্যাত একটি দলের পক্ষে এহেন বিষয় বিড়ম্বনা সৃষ্টি করেছে বৈকি।
৯০ পাতার এই ইস্তেহারে, সাশ্রয়ী মূল্যের খাদ্যশস্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ৪৮ নম্বর পাতা কৃষকদের ধান শুকানোর একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে ছবিটির উৎস পাওয়া গেছে স্টক ফটোগ্রাফি প্ল্যাটফর্ম Pexels-এ। ছবিটি দিবাকর রায় নামে এক ব্যক্তি আপলোড করেছিলেন এবং এর লোকেশন হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের হাবড়া উল্লেখ করা ছিল। তাঁর Unsplash প্রোফাইল থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তিনি কলকাতার একজন ফটোগ্রাফার।

শুধু তাই নয়, ইস্তেহারের ৪৬ নম্বর পাতায় কৃষি বিভাগের শুরুতে একটি এআই (AI) জেনারেটেড ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা একটি ভারতীয় স্টক ফটো ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া হয়েছে।
মানবসম্পদ ও জনজীবনের মানোন্নয়ন বিভাগে ৫৩ নম্বর পাতার একটি কোলাজে ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্যের একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। মূল ছবিটি পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে আয়োজিত বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পৌষ মেলায় তোলা হয়েছিল। গেটি ইমেজেসের এই ছবিটি ২০১৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর ফটোগ্রাফার বিশ্বজিৎ দে তুলেছিলেন।

একই বিভাগে ৫৫ নম্বর পাতায় একটি সর্ষে ক্ষেতের পাশ দিয়ে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের দৌড়ানোর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, একটি আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থা বোঝাতে ইস্তেহার জুড়ে এই ছবি বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। এই ছবিটির সবথেকে পুরনো সংস্করণ পাওয়া গেছে ২০১৭ সালে প্রকাশিত উত্তর প্রদেশ সরকারের শিশুশ্রম বিষয়ক একটি রিপোর্টে।
ইস্তেহারের ৬২ নম্বর পাতায় একজন চিকিৎসক এক শিশুকে চিকিৎসা করছেন এবং অভিভাবকরা পাশে অপেক্ষা করছেন—এমন একটি ছবি রয়েছে। রিভার্স সার্চের মাধ্যমে ছবিটি পাওয়া যায় 'সুলভ উপচার কেন্দ্র' নামে একটি ভারতীয় স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগের ওয়েবসাইটে। এই কোম্পানিটি ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি ভারতে নিবন্ধিত হয়েছিল।

একইভাবে ৭১ নম্বর পাতায়—যেখানে ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং আবাস পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে—সেখানে একটি মনোরম দৃশ্য ফুটে উঠেছে যেখানে মাঠে গরুর সঙ্গে এক ব্যক্তির হাঁটার ছবি দেখা যায়। এই ছবিটি মূলত ববি জোশি নামে এক ভারতীয় ব্যবহারকারী 500px.com-এ পোস্ট করেছিলেন এবং ক্যাপশনে এটিকে "ভারতের গ্রামীণ ল্যান্ডস্কেপ" হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
৮১ এবং ৮২ নম্বর পাতায় সমাজকল্যাণ বিভাগে সেলাই মেশিন চালানো মহিলাদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এই ছবিগুলোও ImagesBazaar নামে ভারতীয় স্টক ফটোগ্রাফি ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া।

ইস্তেহারে সেলাই মেশিন ব্যবহার করা এক মহিলার ছবি থেকে নিয়ে তাতে আবার এআই দ্বারা কারসাজি করা হয়েছে। আসল ছবিতে মহিলার মাথায় কোনও ঘোমটা ছিল না। সেই সঙ্গে সেলাই মেশিনের গায়ে বাংলাদেশ সরকারের কোনও লোগোও ছিল না। তবে ইস্তেহারের ছবিতে সেগুলি জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
জামাতের ভারতবিরোধী অবস্থান
জামাত-এ-ইসলামি দীর্ঘকাল ধরে ভারতের কঠোর সমালোচনা করে আসছে। সীমান্ত হত্যা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য তারা বারবার নয়াদিল্লিকে অভিযুক্ত করেছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই দলের প্রধান ম. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছিলেন যে, ভারত বাংলাদেশের মানুষকে বিভিন্ন শিবিরে ভাগ করে সমাজে মেরুকরণ তৈরি করছে। তিনি জনসমক্ষে ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, নয়াদিল্লিকে অবশ্যই সহযোগিতা এবং হস্তক্ষেপের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে জামাত নেতাদের বক্তব্যে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। এখন তারা বক্তব্যে সার্বভৌমত্ব, ন্যায়বিচার এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের মতো বিষয়গুলোতে বেশি জোর দিচ্ছে। ২০২৪ সালে একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামাত প্রধান দাবি করেছিলেন যে, তাঁর দল "কখনোই ভারত-বিরোধী ছিল না।"
জামাত নেতাদের অবস্থান যাই হোক না কেন, অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও, তাদের নির্বাচনী ইস্তেহার যে ভারতের সমাজব্যবস্থার অনুকরণই করতে চাইছে।