

গত ১০ মে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন অভিনেতা থেকে রাজনেতা হয়ে সাড়া ফেলে দেওয়া থালাপতি বিজয়। তাঁর শপথ অনুষ্ঠানের পর থেকে একাধিক বাংলাদেশি সংবাদ মাধ্যমে বিজয়ের একটি কথিত মন্তব্য নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এই খবর অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন যে, “মুসলিমদের অত্যাচার করলে কোনো হিন্দুকে ছাড় নেই!” বাংলাদেশি সংবাদ মাধ্যম NTV-তে এই খবর প্রকাশ পেয়েছে।

NTV ছাড়াও ইনসাফ 24, DSK TV, Radio Padma News, কালবেলা, চ্যানেল আই, ডিবিসি নিউজ, আমার দেশ, ইত্তেফাক, মানবজমিন, মাছরাঙা টিভি, জাগোনিউজ২৪-এর মতো একাধিক সংবাদ মাধ্যমে এই খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রত্যেকটি খবরের শিরোনামেই যা লেখা হয়েছে তার সারমর্ম হলো, “মুসলিমদের অত্যাচার করলে কোনো হিন্দুকে ছাড় দেওয়া হবে না”, এমন মন্তব্য করেছেন থালাপতি বিজয়।
অনেক ফেসবুক ইউজারও এই নিউজকার্ডগুলি নিজেদের প্রোফাইলে শেয়ার করে একই দাবি করেছেন।
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে থালাপতি বিজয় কোনও সম্প্রদায়ের মানুষকেই নিশানায় নিয়ে এমন কোনও মন্তব্য করেননি। তাঁর এই উক্তিটি পুরোপুরি মনগড়া ও মিথ্যা।
সত্য উদ্ঘাটন
যদি দেশের কোনও রাজ্যের নবনির্বাচিত কোনও মুখ্যমন্ত্রী কোনও একটি সম্প্রদায়কে নিশানায় নিয়ে এমন মন্তব্য করে থাকতেন, তবে তা জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষিতে বড় খবর হতো। নানা সংবাদ মাধ্যমে এই নিয়ে খবরও প্রকাশ পেত। কিন্তু এই ধরনের কোনও খবরই কোনও বিশ্বস্ত সংবাদ মাধ্যমে পাওয়া যায়নি।
তবে বেশ কিছু বাংলাদেশি সংবাদ মাধ্যমে এই খবরের তথ্যসূত্র হিসেবে “আরআর চ্যানেল” নামে একটি বাংলাদেশ ভিত্তিক ফেসবুক পেজ, এবং ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এবিপি নিউজের কথা উল্লেখ করা হয়। বলাই বাহুল্য, এবিপি নিউজের নানা ভাষাভিত্তিক ওয়েবসাইট পেজের কোথাও এই ধরনের কোনও সংবাদ পাওয়া যায়নি।
তবে আরআর চ্যানেল নামের পেজে দেখা যায় থালাপতি বিজয়কে উদ্ধৃত করে এই মন্তব্যটি প্রচার করা হয়েছিল গত ১১ মে। অর্থাৎ, ১০ মে থালাপতি বিজয় শপথগ্রহণ করার পরের দিন।
তারও আগে, গত ৯ মে, অর্থাৎ থালাপতি বিজয় মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার আগের দিনই অবশ্য এই একই ধরনের কথিত মন্তব্য “জ্ঞানের জন্য পড়ি” নামের আরেকটি বাংলাদেশ-ভিত্তিক পেজ থেকে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু এই কথিত বক্তব্যের সমর্থনে কোনও সূত্রই কোনও ফেসবুক পেজে দেওয়া হয়নি।
শপথ নেওয়া ইস্তক থালাপতি বিজয় এই ধরনের কোনও মন্তব্য, বা কী কী মন্তব্য করেছেন, সেই সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিওয়ার্ড সার্চ করা হলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। গত ১০ মে, থালাপতির শপথগ্রহণের দিন প্রকাশিত এই খবরে তাঁর বক্তব্যের মূল অংশগুলি তুলে ধরা হয়।
সেখানে থালাপতি বিজয়কে উদ্ধৃত করে লেখা হয়, “এটি এক নতুন সূচনা। প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ ও সামাজিক ন্যায়ের এক নতুন যুগের সূচনা।” সেই সঙ্গে লেখা হয় যে সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে এক বার্তায় তিনি বলেছেন, “বিজয়কে ১০০ শতাংশ ভরসা করতে পারেন। আমি হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান— সবারই জন্য সমান।”
তামিলনাড়ু সরকারের একটি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে থালাপতি বিজয়ের একটি বক্তব্যের ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে তিনি যে মন্তব্য করেন তার সারমর্ম দাঁড়ায় — ভাই ও বোনেরা, সরকার আপনাদের পাশে রয়েছে এবং এই নিয়ে মনে কোনও সংশয় রাখবেন না। হিন্দু, মুসলিম এবং খৃষ্টান, সবার প্রতিনিধি বিজয়। সরকার সংখ্যালঘু ভাই বোনেদের পাশেও সন্দেহাতীতভাবে থাকবে। বিজয় সকলের প্রতিনিধি। এবং এই বিষয়ে ১০০ শতাংশ বিশ্বাস রাখতে পারেন।
এই বিষয়ে আরও নিশ্চিত হতে আমরা যোগাযোগ করেছিলাম ইন্ডিয়া টুডের চেন্নাই এবং ভেলোরের সংবাদদাতাদের সঙ্গে। চেন্নাইয়ের সাংবাদিক আনাঘা, এবং ভেলোরের সাংবাদিক পি মোহনরঙ্গন, দু’জনেই নিশ্চিত করেন যে হিন্দুদের নিশানায় নিয়ে বিজয় এমন কোনও মন্তব্য করেননি। বরং তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে সকল সম্প্রদায়ের অধিকার তাঁর শাসনামলে নিশ্চিত হবে এবং সরকার সকল শ্রেণীর মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবে।
সবমিলিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় যে তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়কে উদ্ধৃত করে এমন একটি সাম্প্রদায়িক মন্তব্য নানা বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে যা আসলে তিনি কখনই করেননি।

তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয় বলেছেন, “মুসলিমদের অত্যাচার করলে কোনো হিন্দুকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
থালাপতি বিজয় এমন কোনও মন্তব্য করেননি। বাংলাদেশের একাধিক সংবাদ মাধ্যম ও ফেসবুক পেজে মনগড়া দাবি প্রচার করা হয়েছে। বাস্তবে তিনি সব ধর্মের মানুষের পাশে থাকার এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও সামাজিক ন্যায়ের সরকার গড়ার কথাই বলেছেন।