

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারলে বন্ধ হয়ে যাবে মাছ-মাংস। এমনই হুমকি নাকি দিয়েছেন হুগলী জেলার চুঁচুড়ার এক বিজেপি নেতা। এই দাবিতে Zee ২৪ ঘণ্টায় সম্প্রচারিত একটি বুলেটিনের ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে।
বাংলার গর্ব মমতা-র মতো বেশ কিছু তৃণমূল কংগ্রেসের সোশ্যাল মিডিয়া পেজ থেকে Zee ২৪ ঘণ্টা-র এই ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছে। সঙ্গে দাবি করা হয়েছে যে, হুগলীর বিজেপি নেতা সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি এহেন হুমকি দিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত Zee ২৪ ঘণ্টা-র ভিডিওতে বিজেপি নেতা সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে শোনা গিয়েছে, “মাছ-মাংস খাওয়া বিহারে বন্ধ করে দিয়েছে বিজেপি সরকার, এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসীন হলে এখানেও মাছ-মাংস বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ, বিহারে ভারতীয় জনতা পার্টির যে সরকার, তাদের নির্দেশিকা জারি হয়েছে, যে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ বা নিষিদ্ধ। এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসলে এখানে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ বা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। কারণ, এটা খাদ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, এবং পরিবেশ সচেতনতার জন্য ও পরিবেশ দূষণ রোধের জন্য। প্রত্যেকের স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য এই হিতকর উপদেশ দিয়েছে বিহারের বিজেপি সরকার। পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসলে এখানে বাঙালিদের মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ বা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে ভাইরাল ভিডিওটি এডিটেড বা সম্পাদিত। আসল বক্তব্যের ভিডিওতে ওই বিজেপি নেতা উল্টো কথাই বলেছিলেন। কিন্তু তা কাটছাঁট করে বর্তমানে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
সত্য উদঘাটন
ভাইরাল ভিডিওটির উৎস সন্ধান করলে ওই ভিডিওটির পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ সপ্তর্ষি রাম নামের ওই নেতার ফেসবুক প্রোফাইলে পাওয়া যায়। সেই সাড়ে ৬ মিনিটের ওই ভিডিওটি শোনা হলে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে Zee ২৪ ঘণ্টায় সম্প্রচারিত বুলেটিন, বা দাবি মিথ্যে। এই ভিডিওতে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করে বলেন যে তারা বিহার সরকারের নির্দেশিকাকে এই রাজ্যে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করছে, যার কারণে মানুষের কাঠে ভুল বার্তা যাচ্ছে। এই ভিডিওতে সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় যা যা বলেছেন তার মূল কিছু অংশ তাঁর বক্তব্যের অনুরূপ নিচে লেখা হলো।
ভিডিওতে সপ্তর্ষি বলেন, "বিহারে মাছ মাংস খাওয়া বন্ধ বা নিষিদ্ধ। এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসলে এখানেও মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ বা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। আজকে এই প্রচার চালাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস। লজ্জা লাগে। আজকে রাজনৈতিকভাবে চরম দেউলিয়াপনার নিকৃষ্ট উদাহরণ হল এই তৃণমূল কংগ্রেস। সেই কারণেই তো, আজকে বিকৃতভাবে এই প্রচার চালাচ্ছে, যে মাছ-মাংস খাওয়া বিহারে বন্ধ করে দিয়েছে বিজেপি সরকার। এবং পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় বিজেপি আসীন হলে এখানেও মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। এর থেকে লজ্জার কি আছে! এরকমভাবে বিকৃতভাবে প্রচার চালানো কারণ বিহারে ভারতীয় জনতা পার্টির যে সরকার, তাতে নির্দেশিকা জারি হয়েছে যে, খোলা আকাশের নিচে যত্রতত্র খোলা অবস্থায় মাছ-মাংস বিক্রয় করা যাবে না। কারণ এটা খাদ্য সুরক্ষার জন্য, স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য এবং পরিবেশ সচেতনতার জন্য পরিবেশ দূষণ রোধের জন্য।"
এরপর তিনি বলেন, "আমরা জানি যে, মাছ-মাংস যে কাটা হয়, বিশেষত পশুকে হত্যা করে তার রক্ত রাস্তায় বয়ে চলে আসে। নালার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় যেখানে খোলা বাজারে বিক্রয় হয়। সেই কারণেই বিহারের সরকার একটা নির্দিষ্ট স্থানে সুরক্ষিত অবস্থায় কাঁচের বাক্সে—যেভাবে মিষ্টান্ন বিক্রয় হয়, সেইভাবে মটন বা চিকেন বিক্রি হয়, তার নির্দেশিকা জারি করেছে। এটা সম্পূর্ণরূপে খাদ্য সচেতনতার জন্য, এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য, পরিবেশ দূষণ রোধের জন্য। কিন্তু বিভ্রান্তকর প্রচার চালাচ্ছে (তৃণমূল কংগ্রেস)। অনেকেই জানে না যে, বিহারের মতো রাজ্যে মটন হান্ডি, চম্পারনের মতো মটন হান্ডি শুধু ভারত নয় পৃথিবী বিখ্যাত। সেখানের অন্যতম আহারই হল মটন হান্ডি। মটন ভাত বিহারের মানুষের এক সুস্বাদু আহার হিসেবে পরিগণিত হয়। এছাড়া, দ্বারভাঙা, মিথিলা অঞ্চলে একাধিক মানুষ, বেশিরভাগ মানুষ সেখানে মাছকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের খাদ্য তালিকায় প্রধান মাছ। অথচ, এখানে তৃণমূল কংগ্রেস প্রচার চালাচ্ছে যে বিহারের মানুষরা শুধু শাকাহারি এবং তারা লিট্টি খায়। সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে আগামী দিনে বিজেপি ক্ষমতায় আসলে এখানে নাকি মাছ-মাংস বিক্রয় বন্ধ হয়ে যাবে, এমন অপপ্রচার তৃণমূল কংগ্রেস চালাচ্ছে।"
বিজেপি নেতা সপ্তর্ষির এই ভিডিও এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তাঁর ভিডিওকে কাটছাঁট করে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে মনে হয় তিনি বলছেন যে এ রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।
সপ্তর্ষির প্রোফাইলে গিয়ে দেখা যায়, ২১ ফেব্রুয়ারি সকালেও তিনি এই ভিডিওটি পুরনার শেয়ার করে লিখেছেন যে তাঁর বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার করা হচ্ছে। ২০ ফেব্রুয়ারিও এই বিষয়ে একটি পোস্ট করে তিনি লিখেছিলেন, “ফেসবুকে আমার একটি ভিডিও বার্তা বিকৃত করে প্রচার চালাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস, এটাই এখন এদের স্বভাব, রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার এক প্রকৃষ্ট প্রমাণ।”
অর্থাৎ, বুঝতে বাকি থাকে না যে হুগলীর বিজেপির নেতা সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সম্পাদিত ও ভুয়ো ভিডিও প্রচার করে মিথ্যে দাবি করা হয়েছে এই বলে, যে তিনি নাকি হুমকি দিয়েছেন যে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস নিষিদ্ধ করে দেবে।

হুগলীর বিজেপি নেতা সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় হুমকি দিয়ে বলেছেন যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ভাইরাল ভিডিওটি সম্পাদিত, কাটছাঁট করে তৈরি করা। আসল ভিডিওতে সপ্তর্ষি বলেছিলেন যে তৃণমূল কংগ্রেস বিহারে বিজেপির একটি নির্দেশিকার পর এই ধরনের বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর প্রচার শুরু করেছে।